বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল ত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) অমর একুশে ফেব্রুয়ারির ৭৪ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে।
আজ শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ এবং সর্বস্তরের জনগণ ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। একুশের ভোরে সাধারণ মানুষ কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রভাতফেরিসহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে শ্রদ্ধা জানাবেন।
নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী জানিয়েছেন, একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তা শঙ্কা নেই। তবে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। পুরো এলাকা ৬৪টি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এছাড়া ডগ স্কোয়াড, বোম ডিসপোজাল ইউনিট ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
এছাড়া, একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে দেশে কোনো ধরনের নিরাপত্তা শঙ্কা বা হুমকি নেই বলে জানিয়েছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর মহাপরিচালক এ কে এম শহীদুর রহমান। তিনি বলেন, ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কোনো থ্রেট বা হুমকি নেই। তবে আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রয়েছে।
তিনি জানান, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে র্যাব সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। ইনার ও আউটার প্যারিমিটারে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং পুরো এলাকা কয়েকটি সেক্টরে ভাগ করে নজরদারি চালানো হচ্ছে। প্রতিটি সেক্টরে থাকবে ফুট পেট্রোল, গাড়ি পেট্রোল ও স্ট্রাইকিং রিজার্ভ টিম।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্য, ডগ স্কোয়াড ও বোম ডিসপোজাল ইউনিট দায়িত্ব পালন করবে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও আশপাশের এলাকায় আগেই সুইপিং কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ৬৪টি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো এলাকা নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
র্যাব ডিজি আরও বলেন, শুধু রাজধানী নয়, সারাদেশের শহীদ বেদীতেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর সমন্বয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতার মধ্য দিয়ে একুশের কর্মসূচি সম্পন্ন করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেসকো) কর্তৃক স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। বাঙালি জাতির কাছে এটি একদিকে যেমন গভীর শোক ও বেদনার দিন, অন্যদিকে মাতৃভাষার অধিকার আদায়ে সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল এক ঐতিহাসিক দিন হিসেবে স্বীকৃত।
ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তৎকালীন পূর্ব বাংলার ছাত্র ও যুবসমাজ শাসকগোষ্ঠীর জারি করা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসে।
মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকসহ নাম না–জানা আরও অনেকে শহীদ হন। তাদের সেই মহান আত্মত্যাগই আজ বিশ্বজুড়ে ভাষাপ্রেম ও মৌলিক অধিকার আদায়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও দিনটি উপলক্ষে বাংলাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আগামীকাল দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। ভাষাশহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় আজিমপুর কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ ও কোরআনখানির বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে।
এ ছাড়া দেশের সব মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সব স্যাটেলাইট চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত হবে বিশেষ ক্রোড়পত্র।