বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পেছনের কারণগুলো কী

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির একটি প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। প্রস্তাব অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে দেড় টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধান এবং ভর্তুকির বাড়তি চাপ সামাল দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় মোকাবিলায় অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে সরকার। ওই কমিটির পরামর্শেই মূলত বিদ্যুৎ বিভাগ প্রস্তাবটি দিয়েছে।
প্রস্তাবনা মতে, মাসে ৪০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের প্রতি ইউনিটে প্রায় ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। ৭৬ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য এই বৃদ্ধি প্রায় ৭০ পয়সা হতে পারে। তবে ৭০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী (লাইফলাইন গ্রাহক)রা আপাতত এই বাড়তি চাপের বাইরে থাকবেন।

Electricity

বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় খরচ গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা দামের চেয়ে প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা বেশি। এই ঘাটতি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে আরও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে এ খাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে।
সরকারি সংস্থা ও বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে মূল্যবৃদ্ধির কয়েকটি কারণ জানা গেছে। যেমন—
১. বাংলাদেশের বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস, তেল ও কয়লায় চলে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব জ্বালানির দাম গত দেড় বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এ ছাড়া সংকট মোকাবিলায় ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্র চালাতে হচ্ছে, যার খরচ অনেক বেশি। এই অতিরিক্ত খরচ সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে।

২. দেশে প্রায় দেড় ডজন বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও সেগুলো নিষ্ক্রিয় রাখা যাচ্ছে না। এসব কেন্দ্র বন্ধ রেখেও সরকারকে প্রতি মাসে ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ দিতে হয়। তাছাড়া অনেক চুক্তিতে শুরু থেকেই দাম বেশি ছিল, যা ইউনিটপ্রতি বিলের ওপর চাপ ফেলছে।
৩. বিদ্যুৎ খাতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও জ্বালানি আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় একই পণ্য কিনতে এখন বেশি টাকা দিতে হচ্ছে, যা বিদ্যুতের দামে যুক্ত হচ্ছে।
৪. স্বচ্ছতা আনার জন্য স্মার্ট মিটার বসানো হচ্ছে, যা মাসিক বিল কিছুটা নির্ভুল করলেও এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভ্যাট, সারচার্জ, পুনর্বাসন তহবিল কর ইত্যাদি—যা বিলের অঙ্ক কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
৫. শিল্প-কারখানার পাশাপাশি এখন ইলেকট্রিক গাড়ি, দোকানপাট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু সরবরাহ সে অনুপাতে বাড়েনি। ফলে চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় দাম নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সৌর, বায়ু) দ্রুত সম্প্রসারণ না করলে আমদানি নির্ভরতা থেকে বের হওয়া যাবে না। একইসঙ্গে পুরোনো অদক্ষ কেন্দ্র বাদ দিয়ে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করতে হবে। স্বল্পমেয়াদে ভর্তুকি বাড়ানো ছাড়া সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমানো সম্ভব নয়।’
বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ কোটি ৯৭ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ সরাসরি এই মূল্যবৃদ্ধির আওতায় পড়তে পারেন। বাকি ৬৩ শতাংশ স্বল্প ব্যবহারকারী তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকতে পারেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের খরচ বাড়লে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামে পড়বে। প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধি ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমালেও শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে নতুন চাপ তৈরি হবে।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য গড়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছিল। তখন প্রতি ইউনিটের গড় খুচরা মূল্য ছিল ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। একই সময় পাইকারি মূল্যহার ৫ দশমিক ০৭ শতাংশ বেড়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।