বেবিচক জুড়ে সমালোচনার ঝড়

দুদকের মামলার আসামিকে ৫ কোটিতে পদোন্নতির অভিযোগ

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বিতর্কিত প্রকৌশলী ও আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক বিমান মন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আমিনুল হাসিবকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তিনি সুপারিনটেনডেন্ট চলতি দায়িত্বে থাকলেও বর্তমানে তাকে পদোন্নতি দিয়ে সুপারিনটেনডেন্ট করা হয়েছে। বিতর্কিত এই প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দেওয়ায় বেবিচক জুড়ে সমালোচনার ঝড় শুরু হয়েছে।

জানা গেছে, কর্নেল ফারুক খান তার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় আমিনুল হাসিবকে ২০২৩ সালে সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে চলতি দায়িত্ব প্রদানের সুপারিশ করেন। বেবিচক তাকে চলতি দায়িত্বও প্রদান করে। দীর্ঘ ৪ বছর তিনি চলতি দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তাকে গত মাসের শেষের দিকে পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বেবিচক কর্মকর্তারা বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের যে কয়জন আস্থাভাজন কর্মকর্তা বেবিচকে রয়েছেন, তার মধ্যে হাসিব অন্যতম। ফারুক খানের প্রভাব খাটিয়ে তিনি এমন কিছু নেই যা করেননি। বেবিচকের বড়-বড় প্রজেক্ট থেকে কোটি কোটি টাকা অবৈধপথে আয় করেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী দোসর হিসেবে তার অপসারণও দাবি করা হয়। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

কর্মকর্তারা বলেন, আওয়ামী ঘেঁষা ঠিকাদারদের সঙ্গেও তার রয়েছে গোপন আঁতাত। বর্তমানে সেই সব ঠিকাদারকে তিনি নানাভাবে সুবিধা দিয়ে আসছেন।

অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ৫ কোটি টাকার বিনিময়ে তিনি এই পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেবিচকের প্রকৌশলী আমিনুল হাসিবের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিগত ২০২৩ সালে তাকে সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার চলতি দায়িত্ব দেওয়া হলেও শুধু অনিয়মের কারণে তার পদোন্নতি হয়নি। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের মামলা থাকায় দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

২০১৯ সালের নভেম্বরে কক্সবাজার প্রজেক্টে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে বরখাস্ত করে বেবিচক। কিন্তু পরবর্তীতে ২০২১ সালে বিভিন্ন জায়গায় সুপারিশ করে আবার তিনি চাকরি নিয়মিত করেন। বর্তমান কর্মকর্তারা জানান, তৎকালীন চিফ ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান সিভিল সার্কেল ৩-এর পূর্বের ১০ বছরের কাজের তদন্ত শুরু করেন। কিন্তু এই বিতর্কিত ইঞ্জিনিয়ার আমিনুল হাসিব তাকে বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা করে তদন্ত করতে দেননি। এখন সবার একটাই দাবি, এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সিভিল সার্কেল ৩-এর গত ১০ বছরের সকল কাজের তদন্ত করা হোক।

জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গত বছরের ২১ থেকে ২৮ ডিসেম্বর তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও লন্ডন সফর করেছেন। বিষয়টি তিনি কর্তৃপক্ষকেও জানাননি। ভ্রমণের সময় তার পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে তিনি কর্তৃপক্ষকে জানান এবং কর্তৃপক্ষের সহায়তায় গোপনে দেশে ফিরে আসেন। একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুর্নীতির টাকা পাচারের উদ্দেশ্যে এসব দেশ ভ্রমণ করেছেন; তা ছাড়া একজন ইঞ্জিনিয়ার এত টাকা খরচ করে এসব দেশে ভ্রমণ করার কোনো কারণ খুঁজে পাই না আমরা।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সকলেই এ বিষয়ে পরবর্তীতে অবগত হয়েছেন, কিন্তু এখনও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি প্রতি ২/৩ বছর পর পর একজন কর্মকর্তাকে বদলি করার সরকারি নিয়ম থাকা সত্ত্বেও একজন চলতি দায়িত্বের কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে এখন পর্যন্ত ৪ বছর ধরে একই পদে আছেন।

সম্প্রতি তাকে পদোন্নতি দেওয়ায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাকে ৫ কোটি টাকার বিনিময়ে এই পদ বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি।

তিনি প্রতি ঠিকাদারের থেকে কমপক্ষে শতকরা ৫ ভাগ কমিশন আদায় করেন। এই টাকা বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত ওয়ার্ক অর্ডার দেন না বলে ঠিকাদাররা অভিযোগ করেন। এভাবে তিনি শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার মেয়েকে লন্ডনে লেখাপড়া করাচ্ছেন। সেখানের পড়াশোনার খরচ বহন করতে হয় কোটি টাকার ওপর।

গোপনে বিদেশ সফর করার পরও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, তাকে পুরস্কৃত করে প্রমোশন দেওয়া হয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মেম্বার প্রশাসন লাভলুর রহমানের আশীর্বাদে তিনি সকল অন্যায়-দুর্নীতি করে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে আমিনুল হাসিবের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।