একটি ছবি বা প্রতীকের চেয়ে তার পেছনের সত্য ইতিহাস প্রকাশ করাই মূল বিষয়। সম্প্রতি ডাকসু ভবনের সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং ইসলামী ছাত্র সংঘের তৎকালীন নেতা আবদুল মালেকের ছবি রাখা কেন্দ্র করে তৈরি বিতর্ক কেবল ছবি সরানো বা রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর মাধ্যমে তৈরি হয়েছে একটি বড় প্রশ্ন—ইতিহাসের বিতর্কিত চরিত্রদের ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া উচিত, নাকি তাদের নেতিবাচক ভূমিকা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার নথিসহ সামনে রাখা প্রয়োজন?
ইতিহাস কোনো দৃশ্যমান ছবি কিংবা স্লোগান দিয়ে তৈরি হয় না; ইতিহাস গঠিত হয় দীর্ঘ আন্দোলন, মানুষের অধিকারের সংগ্রাম, রক্ত ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে। ১৯৪৮ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মাতৃভাষার দাবি থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালেই মারা গেলেও, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান ছিল বাঙালিদের ওপর বৈষম্যের সূচনা। অন্যদিকে, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের ভূমিকা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে ইতিহাসে সংরক্ষিকোনো ব্যক্তি বা দলকে আর্কাইভে স্থান দেওয়ার অর্থ এই নয় যে তাদের অপকর্মকে সমর্থন দেওয়া হচ্ছে; বরং তাদের বিতর্কিত অবস্থান ও ইতিহাসের সত্য তুলে ধরাই একটি জাদুঘরের প্রধান কাজ।
বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক পরিবর্তন বা নির্বাচনী ফলাফল যেমন অতীতে ঘটে যাওয়া অপরাধকে মুছে দিতে পারে না, তেমনি সত্য ইতিহাস লুকানোর চেষ্টাও ব্যর্থ হতে বাধ্য।
ছবি ছিঁড়ে ফেলা কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো চরিত্রকে ঢাকতে চাওয়া কোনো সুস্থ ইতিহাস চর্চা নয়। নতুন প্রজন্মের সামনে অর্ধসত্য বা আবেগ না চাপিয়ে, জিন্নাহর বক্তব্য থেকে শুরু করে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব এবং ১৯৭১-এর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের মতো সমস্ত নিরপেক্ষ ও ঐতিহাসিক দলিল তুলে ধরাই হলো ডাকসুসহ প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান দায়িত্ব।