প্রাচীন বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশে যে ধর্মশিক্ষা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছিল তা কালের আবর্তে প্রায় সবগুলোই লয়প্রাপ্ত। সেই বৈদিক-শিক্ষা থেকে শুরু করে পাল শাসনামলেই পূর্ণমাত্রায় যা বিকশিত হয়। পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করলেও পরবর্তীতে নানামুখী বিজ্ঞান ভিত্তিক জীবনমুখী আধুনিক শিক্ষার রূপ পায়। পশ্চিমা বিশ্ব তথা উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের জন্য ছিল অনুকরণীয়। যাহোক এ পর্যায়ে অবিভক্ত বাংলায় তথা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে প্রাচীন কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও এগুলোর পরিচয়-শিক্ষা-কার্যক্রম সংক্ষিপ্ত পরিসরে উপস্থাপন করা হলো।
শিক্ষায় সমৃদ্ধ প্রাচীনতম সভ্য দেশগুলোর মধ্যে ভারতবর্ষ অন্যতম। প্রাচীনকালে সহজ সরল ঋষি থেকে শুরু করে বর্তমান যুগের বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন ধারায় চলে আসছে এ শিক্ষা প্রচেষ্টায়। প্রাচীন আর্য উপনিবেশের মধ্যে ঋষির আশ্রমে শুরু হয়েছিল শিক্ষার অঙ্কুর বপন। এমন কিছু প্রাচীন প্রসিদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আলোচনা করছি। ইতোমধ্যে তক্ষশীলা ও নালন্দা নিয়ে সংক্ষেপে লিখেছি। এবারের নিবেদন রক্তমৃত্তিকা বিশ্ববিদ্যালয়, সুধী পাঠক আপনাদের সুচিন্তিত মন্তব্য ও পরামর্শ কামনা করছি।
রক্তমৃত্তিকা বিশ্ববিদ্যালয়টি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙামাটি এলাকায় অবস্থিত। অন্যতম প্রাচীন এই রক্তমৃত্তিকা বিশ্ববিদ্যালয় যা ৫ম থেকে ৭ম শতাব্দী পর্যন্ত বৌদ্ধ শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছিল। গুপ্তযুগে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা কেন্দ্রটি সম্রাট শশাঙ্কের কর্ণ সুবর্ণের রাজধানীর সন্নিকটেই অবস্থিত ছিল। যা হিউয়েন সাঙ এর বিবরণী থেকে জানা যায়। হিউয়েন সাঙ যাকে লো-তো-মি-চি বলেছেন সেটিই রক্তমৃত্তিকা। এখানকার মাটির রঙ লাল।
১৯৬২ সালের খনন কার্যে পোড়া মাটির সিলমোহর, মূর্তির ভাঙামাথা ও প্রাপ্ত অন্যান্য নিদর্শন থেকে বিশ্বকে নিশ্চিত করা হয়। সপ্তম শতকে হিউয়েন সাঙ এখানে কিছুকাল অবস্থান করে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। ভাগীরথী নদীর পুরনো গতিপথের কাছে প্রতিষ্ঠিত এই বৌদ্ধ শিক্ষালয়টি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। এটি পঞ্চম শতাব্দীতে স্থাপিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও সুপ্রাচীন ও খ্যাতির শিখরে ছিল বলে মন্তব্য করেন অনেকেই। সত্যি বলতে কি এটি ছিল বৌদ্ধ সন্ন্যাসী পণ্ডিতদের প্রখ্যাত গবেষণা কেন্দ্র।
সেন বংশের প্রতিহিংসার শিকারে দ্বাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিশ্ববিদ্যালয়টি ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে। পরবর্তী পর্যায়ে ১৩ থেকে ১৬ শতাব্দীর মধ্যে সুলতানি ও মোগল শাসনামলে গুরুত্বহীনতায় প্রতিষ্ঠানটি লয়প্রাপ্ত হয়। সর্বোপরি গঙ্গার প্লাবন ভাগীরথীর ভাঙনে ইতিহাস খ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গৌরব হারিয়ে বিলীন হয়ে যায়।
লেখক: শিক্ষক, গবেষক
চেয়ারম্যান (অব.)
রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড।