তক্ষশীলা: পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫১ এএম

প্রাচীন বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশে যে ধর্মশিক্ষা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছিল তা কালের আবর্তে প্রায় সবগুলোই লয়প্রাপ্ত। সেই বৈদিক-শিক্ষা থেকে শুরু করে পাল শাসনামলেই পূর্ণমাত্রায় যা বিকশিত হয়। পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করলেও পরবর্তীতে নানামুখী বিজ্ঞান ভিত্তিক জীবনমুখী আধুনিক শিক্ষার রূপ পায়। পশ্চিমা বিশ্ব তথা উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের জন্য ছিল অনুকরণীয়। যাহোক এ পর্যায়ে অবিভক্ত বাংলায় তথা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে প্রাচীন কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও এগুলোর পরিচয়-শিক্ষা-কার্যক্রম সংক্ষিপ্ত পরিসরে উপস্থাপন করা হলো।

পৃথিবীর প্রাচীনতম শিক্ষাকেন্দ্র রূপে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল। ভারতীয় উপমহাদেশর রত্নগর্ভা তক্ষশীলা পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার বিদ্যার্থী এখানে জড়ো হতো জ্ঞান পিপাসা নিবারণের জন্য। খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ অব্দে শিক্ষা স্ফুরণের এই বিদ্যাপীঠটি পাকিস্তানের ইসলামাবাদের ৩০-৩২ কি. মি. উত্তর পশ্চিমে রাওয়ালপিন্ডি জেলার পাঞ্জাবে অবস্থিত। বর্তমান পাকিস্তানে এর অবস্থান হলেও তা আমাদের অখণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষা, সভ্যতা, ঐতিহ্য, জ্ঞান গরিমা বিকাশের অধিকারী গৌরবজনক অতীত ও হতাশার গৌরব সংমিশ্রণের যৌথ ইতিহাস।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলমন্ত্র ‘জ্ঞানই শক্তি’ বিবেচনায় নিয়ে সারা পৃথিবী থেকে ১০৫০০ জনের ও বেশি বিদ্যার্থী তক্ষশীলায় ভর্তি হতো। এখানে বেদ, ব্যাকরণ, দর্শন, আয়ুর্বেদ, কৃষিবিজ্ঞান, শল্য-বিদ্যা, রাজনীতি, যুক্তিবিদ্যা, জোতির্বিদ্যা, বাণিজ্য, সঙ্গীত, নৃত্য, ধনুর্বিদ্যা, সামাজিক বিজ্ঞান, সর্প কামড়, নিরামবিদ্যা সহ ৬টিরও বেশি বিষয়ের ওপর জ্ঞান অর্জন করতেন।

তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা স্নাতকদের মধ্যে রয়েছেন চাণক্য, পাণিনি, চরক, জীবক, বিষ্ণু, শর্মা, জিভিকা প্রমুখ। তক্ষশীলা গান্ধার রাজ্যের রাজধানী এক বিলুপ্ত বিদ্যাপীঠের নাম। উন্নত কারুশিল্প ও সংস্কৃতি বিকাশের তীর্থস্থান। বৌদ্ধ, হিন্দু, জৈন যুগের শিক্ষা সভ্যতার মূল্যবান পুরাতত্ত্বের এক প্রাচীন সভ্যতার মহিমা মণ্ডিত নিদর্শনের স্মারক তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়। রাজা প্রসেঞ্জিত, সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত, মোহাল্লির মতো আরও অসংখ্য ইতিহাস খ্যাত ব্যক্তিবর্গ রাতদিন নীরবে নিভৃতে সু-নিপুণভাবে গড়ে গেছেন এই প্রতিষ্ঠানটি।

তক্ষশিলায় প্রাপ্ত মূর্তি।

চাণক্য, আত্রেয়, শর্মা ও নাগার্জুনের মতো ইতিহাস খ্যাত জ্ঞানতাপস পণ্ডিত ব্যক্তিদের শিক্ষক রূপে পেয়ে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুখ্যাতি পৌঁছে গিয়েছিল অনতিক্রম্য উচ্চতায়। দ্রুত নজর কেড়েছিল বিশ্ব দরবারে। তক্ষশীলার খ্যাতির পরশ গ্রিক সেনাপতি  আলেকজান্ডারকে এতোটাই তন্ময় করেছিলো- তিনি তক্ষশীলা দখল করার পর কোন ক্ষতি সাধন না করে বেশ কিছু শিক্ষক / পণ্ডিতকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রাচীন সভ্যতায় উন্নত গ্রিক সভ্যতাকে আরও গতিশীল করার মানসে।

তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। বলে রাখা ভালো গৌতম বুদ্ধের (৫৬০খ্রি.পূ-৪৮৩খ্রি.পূ) জন্ম, বিকাশ ও সিদ্ধি বা বোধী লাভের পর বৌদ্ধ ধর্মকে অন্যতম পাঠ্যক্রম হিসেবে সংযোজন করা হয়। স্বয়ংসম্পূর্ণ এ বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের প্রধান কারণ ছিলো পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে মধ্য এশিয়া থেকে আসা শ্বেত হুনদের (White Huns) ব্যাপক আক্রমণ। হুনদের আক্রমণের পর থেকে তক্ষশীলা রাজ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। মুহুর্মুহু হুনদের আক্রমণে উত্তর ভারতের শাসন ব্যবস্থা অনেকটা লয় প্রাপ্ত হয় এবং তক্ষশীলার মতো শিক্ষালয়গুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত খ্রিষ্টপূর্ব- ২০০-১০০ অব্দের তক্ষশীলার মুদ্রা

তবে তক্ষশীলা সহ পাল সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা বিহার ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ধ্বংসের শেষ পেরেক ঠুকে সেন বংশের (১০৯৭-১২০৪খ্রি.) শাসকরা। সেনদের পরাজয় করে তুর্কি শাসক বখতিয়ার খলজি রাজ্যভার গ্রহণ করেন। তবে মুসলিম শাসক দ্বারা ভারত বর্ষের বিশেষত পাল আমলের শিক্ষালয়গুলোর (বিহার/বিশ্ববিদ্যালয়) কতটুকু ক্ষতি সাধিত হয়েছে তা পুনরায় গবেষণার দাবি রাখে।

লেখক: শিক্ষক, গবেষক 
চেয়ারম্যান (অব.)
রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড।

YA/SN
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত