নালন্দা: পৃথিবীর প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০০ এএম

প্রাচীন বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশে যে ধর্মশিক্ষা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছিল তা কালের আবর্তে প্রায় সবগুলোই লয়প্রাপ্ত। সেই বৈদিকশিক্ষা থেকে শুরু করে পাল শাসনামলেই পূর্ণমাত্রায় যা বিকশিত হয়।পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করলেও পরবর্তীতে নানামুখী বিজ্ঞান ভিত্তিক জীবন মুখি আধুনিক শিক্ষার রূপ পায়।পশ্চিমা বিশ্ব তথা উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের জন্য ছিল অনুকরণীয়। যাহোক এ পর্যায়ে অবিভক্ত বাংলায় তথা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে প্রাচীন কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও এগুলোর পরিচয়-শিক্ষা-কার্যক্রম  সংক্ষিপ্ত পরিসরে উপস্থাপন করা হলো।

প্রাচীন ভারতের বর্তমান বিহার রাজ্যের রাজগিরে অবস্থিত নালন্দা ছিল সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। যা স্থাপিত হয় চতুর্থ শতাব্দীর দিকে শেষের দিকে বা পঞ্চম শতাব্দীর প্রথমার্ধে। নালন্দা (Nalanda) শব্দের বেশ কটি অর্থ আছে। তা হলো: "জ্ঞানের অবিচ্ছিন্ন দান" বা যে জ্ঞানের দান কখনও শেষ হয়না। আবার অনেকে নালন্দা শব্দকে জ্ঞানদাতা বলেও অবিহিত করেছেন। এখানে অধীত বিদ্যার্থীর সংখ্যা ছিল ৭৫০০ জন, শিক্ষক ছিলেন ১৫০০ জন এবং কর্মকর্তা কর্মচারী ছিলেন ১২০০জন। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খাবার, পোশাক, গ্রন্থাদি প্রভৃতি সরবরাহ করা হতো।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়

"বিদ্যা অকৃপণ দান" এই মূলমন্ত্র নিয়ে কুমার গুপ্ত-১ এ বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে মনে করা হয়। গুপ্ত সম্রাট দ্বারা স্থাপিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়টি খ্রিস্টের জন্মের কিছুকাল আগে থেকেই বিকাশ লাভ করেছিল বলে অনেকে দাবি করেন। নালন্দা সম্পর্কে জনৈক ইতিহাসবিদ লিখেছেন- The "University of Nalanda was the educational centre of international moral comparable in the universalism of its thought, the wide range of its studies, the international character of its community to the greatest universities of modern time like Oxford, Cambridge, Paris and Harvard."

১১৯৩ সালের তুর্কি আগ্রাসনের পূর্বে তিব্বত, চীন, গ্রিস, কোরিয়া, জাপান, পারস্য পর্যন্ত নালন্দাই ছিল বিদ্যার্জনের প্রধান পাদপীঠ। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈদিক শিক্ষার আধুনিক বিশ্লেষণ সহ বৌদ্ধ ধর্মের নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা হতো। কথিত আছে গৌতম বুদ্ধের অন্যতম প্রিয় শিষ্য সারিপুত্রের জন্মস্থান নালন্দা। তাই এখানে অসংখ্য বৌদ্ধ ভিক্ষুর আগমন হতো দূর দূরান্ত থেকে। বর্তমান বিহার প্রদেশের চল্লিশ মেইল দূরে দক্ষিণ পশ্চিমে আধুনিক পাটনার রাজগিরে এর অবস্থান।

পৃথিবীর প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়

এ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়টিতেও শব্দবিদ্যা, হেতুবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, দর্শনশাস্ত্র, ধর্মতত্ত্ব, বৌদ্ধ ধর্ম, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, শরীরতত্ত্ব, সঙ্গীত, চিত্রকলা প্রভৃতি বিষয়ে পাঠদান করা হতো। রামকৃষ্ণ মুখার্জি তাঁর Ancient Indian Education গ্রন্থে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ- এর কথা লিখেছেন- 'Foreign students came to the establishment to put an end to their doubtd and then become celebrated.'

নালন্দায় পড়াশুনা অনেক বেশি শ্রুতি নির্ভর ছিল এবং শিক্ষার্থীদের চিন্তার জগতকে প্রসারিত করাই ছিল এ প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য। বস্তুগত প্রাপ্তি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল না বরং শিক্ষা লাভের মূল উদ্দেশ্য ছিল 'Knowledge for Knowledge Sake 'অনেক বেশি অধ্যয়ন, অনুশীলন, আলোচনা, যুক্তি-পাল্টাযুক্তির আশ্রয়ে পঠন-পাঠন চলতো।

লেখক: শিক্ষক, গবেষক 
চেয়ারম্যান (অব.)
রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড।

YA/SN
আরও পড়ুন