এআইকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে?

একটি যন্ত্র মানুষের মতো কথা বলছে। মুহূর্তের মধ্যে লিখে ফেলছে সংবাদ, তৈরি করছে ছবি, বানিয়ে দিচ্ছে ভিডিও, বিশ্লেষণ করছে বিপুল পরিমাণ তথ্য। চিকিৎসককে রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করছে, কৃষককে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিচ্ছে, শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছে, ব্যবসায়ীকে বাজার বিশ্লেষণে সাহায্য করছে। আবার একই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভুয়া ভিডিও, নকল কণ্ঠস্বর, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও প্রতারণার নতুন কৌশল।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তি খাতের বিষয় নয়। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যাংকিং, কৃষি, সংবাদমাধ্যম, প্রতিরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা ও সরকারি সেবা প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের ঝুঁকি ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত, সাইবার হামলা, কপিরাইট বিরোধ, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা।

আর তাই বিশ্বের সামনে এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন-এআইকে নিয়ন্ত্রণ করবে কে?

এর সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্ন জড়িয়ে আছে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, কতটা নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং এমন নিয়ন্ত্রণ কে করবে, যাতে একদিকে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে নতুন প্রযুক্তির বিকাশও অযথা থেমে না যায়?

প্রযুক্তির গতি বনাম আইনের গতি

প্রচলিত আইন তৈরির পদ্ধতিতে কোনো প্রযুক্তি প্রথমে বাজারে আসে। এরপর তার ব্যবহার, সুফল ও ক্ষতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। তারপর সরকার ও আইনপ্রণেতারা প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা তৈরি করেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

কারণ আজ যে এআই ব্যবস্থা শুধু লেখা তৈরি করছে, কয়েক মাস পর সেটিই হয়তো কম্পিউটার সংকেত লিখতে, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সহায়তা করতে, সাইবার দুর্বলতা শনাক্ত করতে কিংবা জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহৃত হচ্ছে।

জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক এআই প্যানেলের ২০২৬ সালের প্রাথমিক প্রতিবেদনে এ কারণেই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআইয়ের সক্ষমতা যে গতিতে বাড়ছে, বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থা সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না। নীতিনির্ধারকদের জন্য আরও বড় সমস্যা হলো কোনো ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার সময় ফুরিয়ে যেতে পারে।

অর্থাৎ নীতিনির্ধারকদের এমন আইন তৈরি করতে হবে, যা শুধু আজকের এআই নয়, আগামী দিনের আরও শক্তিশালী এআই ব্যবস্থাকেও বিবেচনায় রাখবে।

নিয়ন্ত্রণের প্রথম মডেল ইউরোপে

এআই নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বিস্তৃত আইনগত কাঠামোগুলোর একটি তৈরি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই আইনে মূলত ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী এআই ব্যবস্থাকে বিবেচনা করা হয়েছে। কোনো ব্যবহার মানুষের নিরাপত্তা বা অধিকারকে অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় ঝুঁকিতে ফেললে তা নিষিদ্ধ হতে পারে। উচ্চঝুঁকির ব্যবহারের ক্ষেত্রে রয়েছে কঠোর নিয়ম। আবার তুলনামূলক কম ঝুঁকির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণও কম।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে এআই আইন বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য ইউরোপীয় কমিশনের অধীনে এআই কার্যালয় এবং সদস্যদেশগুলোর জাতীয় বাজার তদারকি কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। পাশাপাশি রয়েছে ইউরোপীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্ষদ, স্বাধীন বৈজ্ঞানিক বিশেষজ্ঞদের প্যানেল এবং বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী পরামর্শ ফোরাম।

এতে একটি বিষয় স্পষ্ট শুধু আইন পাস করলেই এআই নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ, পরীক্ষার ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, তথ্যভান্ডার এবং আইন প্রয়োগের শক্তিশালী কাঠামো।

যুক্তরাষ্ট্রের পথ আলাদা

যুক্তরাষ্ট্রের এআই নিয়ন্ত্রণের কাঠামো ইউরোপের চেয়ে আলাদা। সেখানে ফেডারেল নীতি, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নির্দেশনা এবং অঙ্গরাজ্যভিত্তিক আইন ও বিধিমালা মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক কাঠামো তৈরি হয়েছে।

এর ফলে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভিন্ন ধরনের নিয়ম মেনে চলার প্রয়োজন হতে পারে।

এখানে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করলে নতুন প্রযুক্তির বিকাশ ধীর হতে পারে। আবার নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি থাকলে মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

তাই এআই নিয়ন্ত্রণের মূল প্রশ্ন শুধু ‘নিয়ন্ত্রণ করব কি না’ নয়। বরং **কোন ঝুঁকিতে কতটা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন?**

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা উন্নত এআই

এআইয়ের সবচেয়ে উন্নত মডেলগুলোকে বলা হয় সীমান্তবর্তী বা সর্বাধুনিক এআই ব্যবস্থা। এগুলো সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি জটিল বিশ্লেষণ, কম্পিউটার সংকেত লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন ধরনের কাজ সম্পাদন করতে পারে।

এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন। কারণ শুধু ব্যবহারকারীর পর্যায় নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না। দেখতে হবে কে মডেল তৈরি করছে, কী ধরনের তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, কত বড় কম্পিউটার অবকাঠামো ব্যবহার করা হচ্ছে, মডেল প্রকাশের আগে কী ধরনের নিরাপত্তা পরীক্ষা হয়েছে, প্রকাশের পর এর ব্যবহার কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ভুল হলে দায় নেবে কে।

অর্থাৎ এআই নিয়ন্ত্রণকে একটি পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ হিসেবে না দেখে পুরো জীবনচক্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখতে হচ্ছে।

কোম্পানি নিজেই কি নিজের পাহারাদার?

এআই নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো স্বনিয়ন্ত্রণ। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা পরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং ক্ষতিকর ব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা তৈরি করে। এতে প্রযুক্তির বিকাশ দ্রুত হয় এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

কিন্তু সমস্যা হলো একই প্রতিষ্ঠান এআই প্রযুক্তি তৈরি করে এবং সেটি বিক্রি করে অর্থও উপার্জন করে। তাহলে নিরাপত্তার চূড়ান্ত মূল্যায়ন কি সেই প্রতিষ্ঠানের ওপরই ছেড়ে দেওয়া যায়? এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক রয়েছে।

স্বনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে উচ্চঝুঁকির ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাধীন পরীক্ষা, সরকারি তদারকি ও জবাবদিহির প্রয়োজন হতে পারে।

এখানে ওষুধ, বিমান চলাচল কিংবা ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রেও শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ গড়ে উঠেছে।

ডিপফেকের যুগে সত্য যাচাই

এআইয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান ঝুঁকিগুলোর একটি হলো ভুয়া তথ্য। একটি ছবি তৈরি করা, কারও কণ্ঠস্বর নকল করা কিংবা এমন ভিডিও বানানো এখন অনেক সহজ, যেখানে কোনো ব্যক্তি এমন কথা বলছেন বা এমন কাজ করছেন যা তিনি বাস্তবে কখনো করেননি।

রাজনৈতিক ঘটনা, যুদ্ধ, দুর্যোগ, জনস্বাস্থ্য সংকট কিংবা নির্বাচনের সময় এর প্রভাব আরও বড় হতে পারে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার ২০২৪ সালে হালনাগাদ করা এআই নীতিমালায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ছড়ানো ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, কপিরাইট, নিরাপত্তা এবং তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, মানুষের তদারকি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে এখানেও ভারসাম্যের প্রয়োজন। ভুয়া তথ্য ঠেকানোর নামে যদি বৈধ মতপ্রকাশ, সাংবাদিকতা বা সমালোচনার ওপর অযথা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, তাহলে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে।

অতএব এআই শাসন শুধু প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার রক্ষার বিষয়ও।

ব্যক্তিগত তথ্য কার হাতে?

একজন মানুষ এআইয়ের সঙ্গে কথা বলছেন। সেই কথোপকথনে থাকতে পারে ব্যক্তিগত তথ্য। কেউ ছবি আপলোড করছেন, কেউ নিজের কণ্ঠস্বর ব্যবহার করছেন, কেউ চিকিৎসা বা আর্থিক বিষয়ে প্রশ্ন করছেন।

প্রশ্ন হলো এসব তথ্য কোথায় যাচ্ছে? কে সংরক্ষণ করছে? কতদিন রাখা হচ্ছে? কোন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে?

এআই প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা তাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার গবেষণায় এআই ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার মধ্যে সমন্বিত নীতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। কারণ এআইয়ের জন্য তথ্য ব্যবহারের নিয়ম এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার আইন অনেক দেশে আলাদা পথে তৈরি হয়েছে, যা প্রয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে জটিল করে তুলতে পারে।

চাকরি হারাবে, নাকি কাজের ধরন বদলাবে?

এআই নিয়ে মানুষের অন্যতম বড় উদ্বেগ কর্মসংস্থান। কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হতে পারে। আবার নতুন কাজও তৈরি হতে পারে। ফলে শুধু ‘কত চাকরি হারাবে’ এই প্রশ্ন দিয়ে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার বোঝা সম্ভব নয়।

বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কোন কাজের ধরন বদলাবে, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়বে, কোন কর্মী নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন, প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ দেবে কি না এবং এআই ব্যবহারের সুফল শুধু বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো পাবে, নাকি সাধারণ কর্মীরাও তার অংশীদার হবে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার এআই নীতিমালায় কর্মসংস্থানের পরিবর্তনের জন্য মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতাল থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র ঝুঁকি আরও বড়

এআই যখন কোনো সাধারণ মোবাইল অ্যাপে ব্যবহৃত হয়, ভুলের ক্ষতি তুলনামূলক সীমিত হতে পারে।

কিন্তু একই প্রযুক্তি যদি হাসপাতালের জরুরি ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানি ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যোগাযোগব্যবস্থা কিংবা শিল্পকারখানার নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়, তখন ভুলের ক্ষতি অনেক বড় হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মান ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় বিশ্বাসযোগ্য এআই ব্যবহারের জন্য একটি বিশেষ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরির কাজ করছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত ধারণাপত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরীক্ষা, নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং মানুষের তদারকির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ ভবিষ্যতের এআই নিয়ন্ত্রণে শুধু কোন প্রযুক্তি নিষিদ্ধ হবে, তা বলা যথেষ্ট নয়।

বলতে হবে কোন ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের আগে কী ধরনের পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হবে।

বিশ্বজুড়ে কি একই নিয়ম সম্ভব?

এআইয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো  'এটি কোনো সীমান্ত মানে না'।

এক দেশে তৈরি মডেল অন্য দেশে ব্যবহৃত হতে পারে। একটি দেশের তথ্য অন্য দেশের সার্ভারে থাকতে পারে। একটি ভুয়া ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যে শত দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তাই শুধু জাতীয় আইন দিয়ে এআইয়ের সব ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা বিভিন্ন দেশের এআই নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের ২০২৪ সালের হালনাগাদ নীতিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের বৈজ্ঞানিক প্যানেলও বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

কিন্তু এখানেও বাস্তবতা কঠিন। এআই এখন অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের অংশ। ফলে দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার পাশাপাশি প্রতিযোগিতাও রয়েছে।

বাংলাদেশের সামনে কী?

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এআই একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ।

সরকারি সেবা সহজ করা, কৃষিতে তথ্য দেওয়া, রোগ নির্ণয়ে সহায়তা, শিক্ষায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক সহায়তা, ক্ষুদ্র ব্যবসার উৎপাদনশীলতা বাড়ানো-এআইয়ের ব্যবহার অনেক নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে ভুয়া ভিডিও, অনলাইন প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, কৃত্রিম পরিচয়, স্বয়ংক্রিয় বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত এবং সংবাদমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা।

আইন তৈরি করা এক বিষয়। কিন্তু সেই আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ, পরীক্ষাগার, তথ্য বিশ্লেষণ সক্ষমতা, স্বাধীন তদারকি প্রতিষ্ঠান এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কাঠামো।

তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু বিদেশি আইন অনুকরণ যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন দেশের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নীতির সমন্বয়।

তাহলে এআইকে নিয়ন্ত্রণ করবে কে?

এই প্রশ্নের সহজ উত্তর আসলে নেই। শুধু সরকার এআই নিয়ন্ত্রণ করবে এমন কাঠামো যথেষ্ট নয়। শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দায়িত্ব দিলেও চলবে না। শুধু বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলীরাও এই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।

কারণ এআই এখন সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে প্রবেশ করছে।

তাই একটি কার্যকর ব্যবস্থায় থাকতে পারে-

  • সরকার—আইন ও জনস্বার্থ নির্ধারণ করবে।
  • স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান—আইন বাস্তবায়ন ও তদারকি করবে।
  • প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—নিরাপত্তা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান—স্বাধীন গবেষণা ও পরীক্ষা করবে।
  • নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম—স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে।
  • আদালত—মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হলে প্রতিকার দেবে।
  • আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো—দেশগুলোর মধ্যে নীতি ও নিরাপত্তার সমন্বয় তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ এআই নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ সম্ভবত কোনো একক প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকবে না।

সাতটি নীতি হতে পারে ভিত্তি

বিশ্বের বিভিন্ন নীতি ও কাঠামো বিশ্লেষণ করলে এআই শাসনের কয়েকটি মৌলিক ভিত্তি সামনে আসে।

এক. ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ: সব এআই ব্যবস্থাকে একইভাবে নিয়ন্ত্রণ না করে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী নিয়ম নির্ধারণ।

দুই. স্বচ্ছতা: কোথায় এআই ব্যবহার হচ্ছে এবং তার সীমাবদ্ধতা কী ব্যবহারকারীকে জানানো।

তিন. মানুষের তদারকি: জীবন, স্বাস্থ্য, অর্থ বা অধিকার-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি যন্ত্রের হাতে না দেওয়া।

চার. স্বাধীন পরীক্ষা: প্রয়োজন অনুযায়ী তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা পরীক্ষা।

পাঁচ. জবাবদিহি: এআইয়ের কারণে ক্ষতি হলে দায় কার তা স্পষ্ট করা।

ছয়. ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা: তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সাত. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: সীমান্ত অতিক্রমকারী ঝুঁকির ক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যে তথ্য, গবেষণা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয় করা।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার নীতিতে স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা, মানবাধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও জবাবদিহির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মান ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোও এআই ব্যবস্থার পুরো জীবনচক্রে ঝুঁকি শনাক্ত, পরিমাপ ও ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেয়।

শেষ প্রশ্ন মানুষেরই

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত শক্তিশালী হচ্ছে, ততই একটি বিষয় পরিষ্কার হচ্ছে এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তিবিদরা নির্ধারণ করবেন না।

কোন কাজ এআই করবে, কোন কাজ করবে না, কোন তথ্য ব্যবহার করতে পারবে, কোথায় মানুষের অনুমতি লাগবে, ভুল হলে কে দায় নেবে এসব আসলে সামাজিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তাই এআই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির প্রশ্নের চেয়েও বড়।

এটি ক্ষমতার প্রশ্ন

  • কে তথ্য নিয়ন্ত্রণ করবে?
  • কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখবে?
  • কে ভুলের দায় নেবে?

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এআইয়ের সুবিধা কি সবার জন্য থাকবে, নাকি তা কেবল কিছু প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত হবে?

জাতিসংঘের বৈজ্ঞানিক প্যানেলের সতর্কবার্তাটি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ যে প্রযুক্তিকে পৃথিবী পুরোপুরি বুঝতে পারেনি, তাকে কার্যকরভাবে শাসন করাও কঠিন।

সুতরাং এআই নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ হয়তো কোনো একটি মন্ত্রণালয়, কোনো একটি আইন কিংবা কোনো একটি দেশের হাতে থাকবে না।

বরং প্রয়োজন হবে আইন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মানবাধিকার, ব্যবসা ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত কাঠামো।

কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত দ্রুত মানুষের জীবনে প্রবেশ করবে, তার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও তত দ্রুত মানুষের সামনে ফিরে আসবে।

আর শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি থাকবে একই

এআইকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে?

উত্তরটি যদি হয় মানুষের জন্য তৈরি আইন, মানুষের তদারকি এবং মানুষের জবাবদিহির মাধ্যমে মানুষই এআইকে নিয়ন্ত্রণ করবে, তাহলেই প্রযুক্তির শক্তি মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের সুযোগ সবচেয়ে বেশি থাকবে।