চীনের স্কুলে সৌচাগারে যাওয়ার আজব নিয়ম!

ক্লাস চলাকালে শিক্ষার্থীদের সৌচাগার ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে চীনের একটি বিদ্যালয়। আজব সেই নিয়ম চালু করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে চীনের দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চবিদ্যালয়টি। প্রতি সেমিস্টারে ক্লাস চলাকালে একজন শিক্ষার্থীকে মাত্র একবার জরুরি প্রয়োজনে সৌচাগারে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার ওই নিয়ম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ তদন্তও শুরু করেছে।

দক্ষিণ চীনের গুয়াংডং প্রদেশের রুয়ুয়ান কাউন্টি হাইস্কুলে এই বিধিনিষেধ চালু করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে South China Morning Post (SCMP)। স্কুলের অভ্যন্তরীণ এক শিক্ষক সভায় উপস্থাপিত পাওয়ারপয়েন্টের একটি ছবি এক শিক্ষক প্রকাশ করার পর বিষয়টি সামনে আসে। প্রকাশিত স্লাইডে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিভিন্ন নির্দেশনা ছিল। সেখানে বলা হয়, ক্লাস চলাকালে একজন শিক্ষার্থী একটি শিক্ষাবর্ষের প্রতিটি সেমিস্টারে সর্বোচ্চ একবার জরুরি প্রয়োজনে সৌচাগার ব্যবহার করতে পারবে।

তবে দ্বিতীয়বার সৌচাগারে যাওয়ার প্রয়োজন হলে বিষয়টি আর সাধারণ প্রয়োজন হিসেবে বিবেচিত হবে না। শিক্ষার্থীকে দ্বিতীয়বার ক্লাসের মধ্যে সৌচাগার ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলেও তার বাবা-মাকে স্কুলে ডেকে পাঠানো হবে। সেখানে শিক্ষার্থীর আচরণ ও একাডেমিক শৃঙ্খলা নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের আলোচনা করতে হবে। তৃতীয়বার এমন ঘটনা ঘটলে শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে, তা ওই পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইডে স্পষ্ট করা হয়নি।

শুধু শিক্ষার্থীদের ওপরই নয়, এই নিয়মের প্রভাব পড়ার কথা বলা হয়েছে শিক্ষকদের ওপরও। শ্রেণিকক্ষের শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে শিক্ষকরা কতটা সফল, সেটিকে তাদের বার্ষিক মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার কথা উল্লেখ করা হয়। এতে শিক্ষকদের পদোন্নতি, কর্মদক্ষতার পুরস্কার এবং পেশাগত মূল্যায়নও প্রভাবিত হতে পারে বলে স্লাইডে জানানো হয়।

স্লাইডে বলা হয়েছে, শ্রেণিকক্ষের শৃঙ্খলা বজায় রাখা শিক্ষকদের দায়িত্বের অংশ। শৃঙ্খলাজনিত কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা শিক্ষকের পেশাগত সক্ষমতা মূল্যায়নের সময় বিবেচনায় নেওয়া হবে। ফলে শিক্ষার্থীদের সৌচাগার ব্যবহারের মতো বিষয়টিও শিক্ষকদের কর্মদক্ষতা ও মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

বিধিনিষেধের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই এটিকে অমানবিক ও অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন। তাদের প্রশ্ন- মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক প্রয়োজন কীভাবে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে? কেউ কেউ স্কুলের পরিবেশকে কারাগারের সঙ্গে তুলনা করেন। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের মৌলিক শারীরিক প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ করতে এমন কঠোর নিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী একজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কর্তৃপক্ষের উচিত এমন অমানবিক নিয়ম অবিলম্বে বন্ধ করা এবং এ ধরনের বিধিনিষেধের জন্য স্কুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। অন্য একজন মন্তব্য করেন, এটি স্কুল, কারাগার নয়। শিক্ষার্থীদের ওপর এমন বিধিনিষেধ আরোপ করা কোনোভাবেই স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আরেক ব্যবহারকারী নিজের স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, তাদের স্কুলে ক্লাস চলাকালে সৌচাগারে যেতে হলে শ্রেণিশিক্ষকের স্বাক্ষর নিতে হতো। অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সৌচাগারে যাওয়ার সুযোগ ছিল না।

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম স্কুলটির সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রথমে এক কর্মী এটিকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে দাবি করেন। পরে তিনি বিষয়টিকে ‘গুজব’ বলেও উল্লেখ করেন। তবে স্থানীয় শিক্ষা ব্যুরো বিষয়টি অস্বীকার করেনি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্কুলটির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তারা পেয়েছে এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

তদন্তে স্কুলের প্রকৃত নীতিমালা কী ছিল, শিক্ষার্থীদের ওপর তা কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে এবং পাওয়ারপয়েন্টে প্রকাশিত নির্দেশনাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত কি না- এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শারীরিক প্রয়োজনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কতটা যুক্তিসংগত- এই ঘটনাকে ঘিরে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।

ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে স্কুলে শৃঙ্খলা ও শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রয়োজনীয়তা। স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফলের ওপরই এখন নির্ভর করছে বিতর্কিত এই নিয়মের ভবিষ্যৎ।