হিমাগারে এক লাখ ৪৩ হাজার বস্তা আলু, লোকসানের শঙ্কা

হিমাগারের কক্ষজুড়ে সারি সারি আলুর বস্তা। অথচ বাজারে দাম এতটাই কম যে, সেই আলু বিক্রি করলেই গুনতে হচ্ছে লোকসান। উৎপাদন থেকে হিমাগারে সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতি কেজি আলুতে খরচ পড়েছে প্রায় ১৮ টাকা। বিপরীতে বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১২ থেকে সাড়ে ১৩ টাকায়। ফলে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর একমাত্র ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষিত এক লাখ ৪৩ হাজার বস্তা আলু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।

হিমাগার কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মার্চে ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজে মোট এক লাখ ৭৮ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে ২২ আগস্ট পর্যন্ত খালাস হয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার বস্তা। ফলে এখনো হিমাগারে পড়ে আছে এক লাখ ৪৩ হাজার বস্তা আলু।

ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, সাধারণত ৬২ কেজি ওজনের এক বস্তা আলু কেনা হয়। বাছাইয়ের পর নষ্ট ও নিম্নমানের আলু বাদ দিলে বিক্রির উপযোগী থাকে প্রায় ৬০ কেজি। এক বস্তা আলু কিনতে গড়ে ৬০০ টাকা, পরিবহন খরচ ৬০ টাকা, হিমাগার ভাড়া ৪৫০ টাকা এবং বস্তার জন্য ১২৫ টাকা খরচ হয়। সব মিলিয়ে প্রতি বস্তায় ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ১৮৫ টাকা।

কিন্তু বর্তমান বাজারে ৬২ কেজির এক বস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৯০০ থেকে ৯২০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি বস্তায় ২০৫ থেকে ২২৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। এই হিসাবে হিমাগারে থাকা আলুতে সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ প্রায় এক কোটি টাকা হতে পারে। বাজারদর আরও কমে গেলে ক্ষতির পরিমাণও বাড়বে।

ফুলবাড়ী পৌরবাজারের আলু ব্যবসায়ী বিধান দত্ত এবার আগের বছরের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার আশায় প্রায় ১০ হাজার বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। 

তিনি বলেন, গত বছরও আলুর কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লোকসান হয়েছিল। সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার প্রত্যাশায় এবার আলু মজুদ করলেও বাজারে অস্বাভাবিক দরপতন ও ক্রেতার সংকটে নতুন করে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মৌসুমি আলু ব্যবসায়ী ফেরাজুল ইসলাম ও নূরুল হক বলেন, অনেক ব্যবসায়ী হিমাগারে আলু রাখার সময় ধারদেনা কিংবা ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছিলেন। মৌসুম শেষে দাম বাড়লে আলু বিক্রি করে লাভের পাশাপাশি ঋণের টাকা পরিশোধের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাজারদর কমে যাওয়ায় এখন আলু বিক্রি করে মূলধন ফেরত পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক আব্দুল আউয়াল মিয়া বলেন, গত মার্চে হিমাগারে এক লাখ ৭৮ হাজার বস্তা আলু রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৫ হাজার বস্তা খালাস হয়েছে। এখনো বিপুল পরিমাণ আলু মজুদ থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব আলু খালাস হবে কি না, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন।

তিনি জানান, গত বছরও দরপতনের কারণে প্রায় ৩৫ হাজার বস্তা আলু কৃষক ও ব্যবসায়ীরা হিমাগার থেকে খালাস করেননি। পরে কিছু আলু হিমাগার কর্তৃপক্ষ বিক্রি করতে পারলেও অধিকাংশই নষ্ট হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেগুলো ফেলে দিতে হয়েছে। এতে হিমাগার কর্তৃপক্ষকেও বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়।

ব্যবস্থাপক আব্দুল আউয়াল মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন বিপুল পরিমাণ আলু পড়ে থাকলে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি হিমাগার কর্তৃপক্ষও ক্ষতির মুখে পড়বে। বাজারদর স্বাভাবিক না হলে এবং সময়মতো আলু খালাস না হলে ভবিষ্যতে হিমাগার ব্যবসা টিকিয়ে রাখাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।