পশ্চিমবঙ্গে কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা, গণপিটুনিতে যুবক নিহত 

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার দক্ষিণ শহরতলির বারুইপুর অঞ্চলে এক কিশোরী হত্যার ঘটনা নিয়ে চলছে তোলপাড়। নিহত ১১ বছর বয়সী ওই কিশোরীর পরিবার অভিযোগ করেছে, তাকে খুন করার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে।

সোমবার (৬ জুলাই) পুলিশের হাতে প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এসেছে। 

রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে পকসো আইনে ধর্ষণের মামলা করেছে পুলিশ। যদিও প্রাথমিকভাবে মামলায় ধর্ষণের উল্লেখ ছিলো না।

পুলিশ প্রশাসন ছয় সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসআইটি গঠন করে ঘটনার তদন্ত চালাচ্ছে।

শনিবার থেকে মেয়েটি নিখোঁজ ছিলো বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। 

পরে রোববার (৫ জুলাই) একটি পুকুর থেকে ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধারের পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ওই এলাকায় এক যুবককে পিটিয়েও হত্যা করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে ক্ষুব্ধ জনতার রোষেই সে নিহত হয়।

রোববার বারুইপুর থানার পুলিশ এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। পরে আও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

এলাকায় পরিস্থিতি এখনো থমথমে। সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী বারুইপুরে টহল দিচ্ছে।

ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ১৬৩ ধারা (আগের ১৪৪ ধারা) অনুযায়ী ওই অঞ্চলে পাঁচজনের বেশি লোকের জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। 

কোনো রকম নতুন সহিংসতা ঠেকাতে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিহতের পরিবারকে সুবিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। 

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) পরিবারটি রাজ্য পুলিশের সদর দফতরে মুখ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করবে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্সি রেঞ্জের আইজি কঙ্করপ্রসাদ বারুই।

ওই অঞ্চলের এক বাসিন্দা সংবাদ সংস্থা এএনআইকে জানান, ‘মাগরিবের নামাজের পরে বোনটি (নিহত কিশোরী) তার বন্ধুর জন্মদিন পালন করতে গিয়েছিল। কিন্তু রাত ৮টার পর থেকে তার আর কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছিল না।’

ওই স্থানীয় বাসিন্দা আরও জানিয়েছেন,‘রাত সাড়ে ৮টার দিকে আমরা থানায় যোগাযোগ করেছিলাম, কিন্তু পুলিশ গুরুত্ব দিচ্ছিল না। রোববার সকালে আমরা স্থানীয়দের থেকে খবর পেলাম। পরে এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দোষীকে আমরাই ধরে ফেলি,।’

তিনি আরো বলেন, ‘দোষী নিজেই থানায় দোষ স্বীকার করেছিল ও তাকে সাথে নিয়েই আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করি। তখনো পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। 

অন্যদিকে শান্তনু মণ্ডল নামে এক স্থানীয় বিজেপি নেতা দোষীকে নিয়ে পালিয়ে যায়।’

ওই স্থানীয় বাসিন্দা ‘দোষী’ বলে উল্লেখ করলেও তার বিরুদ্ধে ওঠা হত্যার অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ।

তিনি শান্তনু মণ্ডল বলে যার নাম উল্লেখ করছিলেন, তিনি হলেন বারুইপুর পশ্চিম তিন নম্বর অঞ্চলের বিজেপির জেনারেল সেক্রেটারি।

অন্য একজন স্থানীয় বাসিন্দা সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে জানান, ‘শান্তনু মণ্ডল প্রথমে স্থানীয়দের ওই পুকুরের কাছে যেতে বাধা দেন এবং আসামিকে আড়াল করার চেষ্টা করেন।’

এই ঘটনার পরেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে অঞ্চল। রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে বিক্ষোভ করতে থাকেন স্থানীয়রা।

যদিও বিজেপি নেতা শান্তনু মণ্ডল সংবাদমাধ্যমে দাবি করেছেন যে তিনি অভিযুক্ত কাউকেই পালাতে সাহায্য করেননি।

তিনি বলেন, ‘আমরাই ঘটনা শোনার পরে আইসির কাছে গিয়ে নালিশ নথিভুক্ত করি। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে একজন ব্যক্তিকে আমরা শনাক্ত করি যাকে ওই বাচ্চাটিকে তুলে নিয়ে যেতে দেখা যায়। আমরাই তৎপরতার সাথে তাকে ধরি এবং সে নিজের দোষ স্বীকার করে।’

শান্তনু মণ্ডল জানান, দোষী জানিয়েছে- যে ওই ঘটনায় চারজন সংঘবদ্ধভাবে নাবালিকার ওপরে নির্যাতন চালিয়েছে। এমনকি পা দিয়ে মেয়েটির গলা চেপে ধরা হয়েছিল।

বারুইপুরে ওই ঘটনার পরে এক অভিযুক্তকে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা সামনে এসেছে। জনরোষ সামাল দিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে বলে জানানো হয়েছে পুলিশের তরফে।

এই ঘটনায় রোববার রাত পর্যন্ত তিনটি মামলা করা হয়েছিল। একটি মামলা কিশোরীকে খুনের ঘটনায়, একটি স্থানীয় জনগণ কর্তৃক পুলিশের উপর হামলা ও অপরটি এক অভিযুক্তকে খুনের মামলা।

শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, পকসো ধারায় ধর্ষণ ও খুনের মামলা রুজু করা হয়েছে প্রাথমিক ময়নাতদন্ত রিপোর্টটি পুলিশের হাতে আসার পরে।

যদিও প্রাথমিক রিপোর্টে কী বলা হয়েছে তা নিয়ে প্রকাশ্য কোনো মন্তব্য করতে চাননি পুলিশ কর্মকর্তারা।

একটি বিশেষ তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে পুলিশ। প্রেসিডেন্সি রেঞ্জের আইজি কঙ্করপ্রসাদ বারুই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সুষ্ঠু তদন্ত করে সাজা নিশ্চিত করা হবে।

রোববার এলাকায় মাইকিং করে তিনি স্থানীয়দের আশ্বাস দেন। 

তিনি বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন এই ঘটনার সাথে জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে।’

অভিযুক্ত একজনকে রোববার গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ছাড়াও আরও দুজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এখন মোট  সংখ্যা হলো তিন। অন্য তিনজন আটক হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কেয়া ঘোষ সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, তৃণমূল কংগ্রেস চক্রান্ত করে এই ঘটনায় ধর্মীয় আবেগ উসকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু তাদের এই অপচেষ্টা ব্যর্থ করা হবে।

পুলিশের উপর আস্থা রাখার আবেদন করেছেন তিনি।

বারুইপুরের ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন কলকাতার আরজিকর হাসপাতালে নির্যাতিতা ডাক্তারের মা রত্না দেবনাথ; তিনি পনিহাটির বিজেপি বিধায়ক। 

ফেসবুকে একটি পোস্টে তিনি লিখেন, ‘সরকার পাশে আছে পরিবারের। মা বাবার কোল খালি করলো যারা, তাদের কড়া শাস্তি হওয়া উচিৎ।’

এছাড়াও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে ‘নরপিশাচ’দের সাথে কোনো আপস করা হবে না।

মমতা ব্যানার্জীকে বাধা

এই ঘটনায় যখন উত্তাল অবস্থা বারুইপুরে, তখন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বারুইপুর যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে রোববার রাতেই তৃণমূল কংগ্রেসে তার অনুগামী নেতারা অভিযোগ করেন যে মমতা ব্যানার্জীর বাড়ির সামনে পুলিশ মোতায়েন করে ঘটনাস্থলে যেতে তাকে বাধা দেয়া হয়েছে।

মমতা ব্যানার্জীর কালীঘাটের বাড়ির সামনে পুলিশ মোতায়েনের ছবি পোস্ট করেন সংসদ সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন। এর পরেই একাধিক ‘মমতাপন্থী’ নেতা কালীঘাটে পৌঁছান।

তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য দোলা সেন কালীঘাট থেকে বলেন, ‘মমতা ব্যানার্জীকে গৃহবন্দী করে রাখার পরিস্থিতি তৈরি করেছে পুলিশ প্রশাসন। 

প্রায় জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এত দিনের অভিজ্ঞ একজন রাজনীতিবিদকে এভাবে আটকে রাখা হলো কেন সেই উত্তর আমরা পুলিশ প্রশাসনের থেকে জানতে চাই।’

এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ জানিয়েছেন, গৃহবন্দী করার অভিযোগ মিথ্যা। তবে মমতা ব্যানার্জীকেও যাতে ডিম ছুড়ে না মারা হয়, তার সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রীকে গৃহবন্দী করার অভিযোগের উত্তরে কেয়া ঘোষ বলেন, ‘তৃণমূলের আমলে যখন নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো সামনে আসত, তখন বিরোধীদের নির্যাতিতার পরিবারের সাথে দেখা পর্যন্ত করতে দেয়া হতো না। এখন তো অভিষেক ব্যানার্জী পরিবারের সাথে ফোনে কথাও বলতে পারছেন।’

নির্যাতিতার পরিবারের সাথে কথা বলার ভিডিও নিজেই ফেসবুকে পোস্ট করেছেন তৃণমূল নেতা ও সংসদ সদস্য অভিষেক ব্যানার্জী।

নির্যাতিতার পরিবারের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘পরিবারের বেদনা বর্ণনার অতীত, এই ঘটনায় দ্রুত শাস্তি বিধানের দাবি জানাই।’সূত্র : বিবিসি