হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় অর্ধেকেরও কম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) মাত্র ছয়টি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে, যা আগের দিনের নয়টি জাহাজের চেয়েও কম এবং গত ১০ দিনের গড় ১২টির প্রায় অর্ধেক।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রাথমিক তথ্যের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া ছয়টি জাহাজের মধ্যে পাঁচটি প্রবেশ করেছে এবং একটি বের হয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি প্যানাম্যাক্স ও একটি ইন্টারমিডিয়েট ট্যাংকার ছিল। তবে কিছু জাহাজ যাত্রাপথে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখায় পরবর্তী সময়ে এ সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তাঝুঁকিকে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে, ইরান জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলার দাবি করেছে এবং ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনার ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনাকারীদের মধ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

শুধু হরমুজ নয়, মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল কিছুটা কমেছে। মঙ্গলবার সেখানে ২৫টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে- ১১টি প্রবেশ করেছে এবং ১৪টি বের হয়েছে। গত ১০ দিনে এই পথে জাহাজ চলাচলের গড় ছিল প্রায় ২৭টি। এসব জাহাজের মধ্যে দুটি সুয়েজম্যাক্স, আটটি আফ্রাম্যাক্স এবং একটি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) ছিল।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যে অত্যন্ত বেশি। সাম্প্রতিক সংঘাতের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমানে সরবরাহের একটি অংশ বিকল্প রুটে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। সৌদি আরবও হরমুজ এড়িয়ে লোহিত সাগরমুখী বিকল্প পথ ব্যবহার করছে।

তবে বিকল্প রুট ব্যবহার করেও হরমুজের গুরুত্ব পুরোপুরি কমানো সম্ভব হচ্ছে না। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজ দিয়ে তেল প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও কিছু পরিমাণ সরবরাহ এখনো অব্যাহত রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প বন্দর ও রুট ব্যবহারের পাশাপাশি সমুদ্রের বাইরে জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের মতো ব্যবস্থাও নিচ্ছে।

জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজারে দেখা যাচ্ছে। বুধবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৯ ডলারে উঠে যায়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গত কয়েক দিনে তেলের দাম টানা বেড়েছে এবং বাজারে সরবরাহ নিয়ে ঝুঁকির আশঙ্কা বাড়ছে।

বিশ্ব বাণিজ্যের জন্যও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা (UNCTAD) সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালির দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোকে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা থেকে ছিটকে দিতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার বৈচিত্র্য ও স্থিতিস্থাপকতাও দুর্বল হতে পারে।

ফলে হরমুজ প্রণালিতে মাত্র ছয়টি পণ্যবাহী জাহাজের চলাচলকে শুধু সাময়িক পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জাহাজ চলাচল আরও কমে যেতে পারে, বাড়তে পারে পরিবহন ও বিমা ব্যয় এবং এর প্রভাব পড়তে পারে তেল, গ্যাসসহ বিভিন্ন পণ্যের বৈশ্বিক দামে। হরমুজের নিরাপত্তা তাই এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।