হরমুজ প্রণালি রক্ষায় ইরানের সামরিক প্রস্তুতি হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি; এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের কৌশলগত পরিকল্পনা। এমন দাবি করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাইল কোসারি।
ইরানের স্টুডেন্ট নিউজ নেটওয়ার্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কোসারি বলেন, আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলা এবং হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি বিভিন্ন প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান ও সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, এসব প্রস্তুতির শিকড় ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ বছরগুলো পর্যন্ত বিস্তৃত। সে সময় থেকেই হরমুজ ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন অপারেশনাল পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।
কোসারির বক্তব্য এমন সময়ে সামনে এলো, যখন হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা তীব্র। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি জোরালো করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করতে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ কৌশল
ইরানের সামরিক কৌশলে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব নতুন নয়। সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার কোসারি এর আগেও জানিয়েছিলেন, প্রণালিটি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের জন্য ইরানের সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে এবং কখন প্রণালি খোলা বা বন্ধ রাখা হবে, সে সিদ্ধান্ত তেহরানই নেবে।
সামরিক বিশ্লেষণেও দেখা যায়, হরমুজকে ঘিরে ইরানের কৌশলে উপকূলভিত্তিক জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, দ্রুতগামী আক্রমণাত্মক নৌযান এবং মাইন ব্যবহারের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংকটের সময় এসব সক্ষমতা দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ তৈরি করা তেহরানের অন্যতম কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের সংঘাতের পর ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে হরমুজের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান এখন প্রণালিটিকে শুধু জ্বালানি পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে কৌশলগত প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান উপায় হিসেবে দেখছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথ
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহন হয়। ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত বা জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণেই হরমুজ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং ইরানের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের কারণে প্রণালির নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
কোসারির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, হরমুজকে ঘিরে ইরানের বর্তমান সামরিক অবস্থান কোনো সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়। বরং কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, সামরিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত চিন্তার সমন্বয়েই তেহরান এই অবস্থানে পৌঁছেছে।
ফলে হরমুজ প্রণালি এখন শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের একটি সামরিক ফ্রন্ট নয়; এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি বড় ভূরাজনৈতিক পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ৫ ইরানি ট্যাংকার ধ্বংস : সেন্টকম
কানাডার দ্বিমুখী নীতিতে ইরানের তীব্র ক্ষোভ