চার বছর আগে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে যে ইয়েমেন কিছুটা স্বস্তির পথে ফিরেছিল, সেই দেশ আবারও পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কি না-এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রযাত্রা এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলপথকে লক্ষ্য করে তাদের হুমকি পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখলের পর বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ইয়েমেনের দীর্ঘ সংঘাতে বড় ধরনের বিরতি এনে দিয়েছিল। কিন্তু সেই বিরতির ভিত্তি এখন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুথি ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছে। এতে শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতিই নয়, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়েও নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মোখা দখল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত মোখা ঐতিহাসিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। এর সবচেয়ে বড় কৌশলগত গুরুত্ব অবশ্য এর অবস্থানে। বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছাকাছি হওয়ায় মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া মানে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডরের আরও কাছে চলে আসা।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাব আল-মান্দাব এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। আনুমানিক বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের ৭ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে যায়। ফলে প্রণালিটির ওপর সামরিক চাপ তৈরি হলে শুধু ইয়েমেন নয়, গোটা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে।
মোখা দখলের পাশাপাশি হুথিরা লোহিত সাগর উপকূলের আরও কয়েকটি কৌশলগত অবস্থানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের লক্ষ্য যদি শেষ পর্যন্ত বাব আল-মান্দাবের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
তেলবাহী জাহাজই কেন প্রধান লক্ষ্য
লোহিত সাগর শুধু সাধারণ পণ্য পরিবহনের পথ নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের তেল ইউরোপ ও অন্যান্য বাজারে পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ রুট। সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলের তেল অবকাঠামো এবং ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে এই সামুদ্রিক করিডরের সরাসরি কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।
হুথিরা ইতোমধ্যে সৌদি আরবের বিভিন্ন জ্বালানি ও সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তাদের হামলার কারণে সৌদি আরবের তেল উৎপাদন ও রপ্তানিতেও চাপ তৈরি হয়েছে। আগস্টে দেশটির তেল উৎপাদন দৈনিক ৬২ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে, যা বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়; একই সময়ে রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
এ পরিস্থিতিতে হুথিদের লক্ষ্য শুধু সামরিক স্থাপনা নয়-সমুদ্রপথ ও তেল সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করাও তাদের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
হরমুজের পর বাব আল-মান্দাব
বর্তমান সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে আরেকটি বিষয়-হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দাবও এখন ঝুঁকির মুখে।
পারস্য উপসাগরের মুখে হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দাব-দুটি ভিন্ন অঞ্চলের জলপথ হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
হরমুজে সামরিক উত্তেজনার কারণে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। এর মধ্যেই বাব আল-মান্দাবেও যদি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হয়, তাহলে জ্বালানি সরবরাহ ও পণ্য পরিবহনে দ্বৈত সংকট তৈরি হতে পারে।
সুয়েজ খালের ওপরও প্রভাব
বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব শুধু তেল পরিবহনে সীমাবদ্ধ নয়। এশিয়া থেকে ইউরোপগামী বহু জাহাজ লোহিত সাগর পেরিয়ে সুয়েজ খাল ব্যবহার করে। এই পথ বন্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে কেপ অব গুড হোপ দিয়ে যেতে হবে।
এর অর্থ-হাজার হাজার কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ, বেশি জ্বালানি খরচ, বেশি বিমা ব্যয় এবং পণ্য পৌঁছাতে দীর্ঘ সময়।
২০২৩ সাল থেকে হুথিদের হামলার কারণে ইতোমধ্যে অনেক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি লোহিত সাগর এড়িয়ে বিকল্প পথে চলাচল করেছে। নতুন করে সংঘাত বাড়লে সেই প্রবণতা আরও তীব্র হতে পারে।
ইয়েমেন কি আবার পুরোপুরি যুদ্ধে ফিরছে?
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখানেই। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ইয়েমেনে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান আনেনি; বরং সামরিক সংঘাতকে সাময়িকভাবে থামিয়ে রেখেছিল।
দেশটি এখনো কার্যত বিভিন্ন শক্তির নিয়ন্ত্রণে বিভক্ত। উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানীয় ও আঞ্চলিক শক্তি জড়িত। সৌদি আরব ইয়েমেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষে এই বিভাজন আবার সামরিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে। কয়েক দিনের সংঘর্ষেই বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে-স্থানীয় সংঘর্ষ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট কাঠামোটিও ভেঙে পড়তে পারে।
ইরানের ভূমিকা কতটা?
হুথিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তেহরান হুথিদের রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সমর্থন করে বলে সৌদি আরব ও পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করে আসছে। তবে হুথিরা ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়-এমন সরল ব্যাখ্যাও সব বিশ্লেষক গ্রহণ করেন না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অবশ্য ইরান ও হুথিদের কৌশলগত স্বার্থের মিল স্পষ্ট। হরমুজে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার পাশাপাশি বাব আল-মান্দাবে হুথিদের সামরিক চাপ বাড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর একই ভূরাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, বাব আল-মান্দাবের ওপর হুথিদের প্রভাব বাড়লে তা ইরানের জন্যও কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। কারণ এতে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সামুদ্রিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সামনে কী হতে পারে?
ইয়েমেনের পরিস্থিতি এখন কয়েকটি সম্ভাবনার দিকে এগোতে পারে। প্রথমত, সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার পথ খুলতে পারে। দ্বিতীয়ত, সৌদি নেতৃত্বাধীন পক্ষ সামরিক পাল্টা অভিযান জোরদার করতে পারে। তৃতীয়ত, হুথিরা বাব আল-মান্দাবের দিকে আরও অগ্রসর হলে সংঘাত আন্তর্জাতিক নৌনিরাপত্তার বড় সংকটে পরিণত হতে পারে।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি হবে-ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সংঘাত একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি মিশে যাওয়া।
তাহলে ইয়েমেন আবার শুধু একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের উদাহরণ থাকবে না; দেশটির উপকূল হয়ে উঠতে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যযুদ্ধের অন্যতম প্রধান মঞ্চ।
মোখা দখল সেই সম্ভাবনারই নতুন সংকেত। আর বাব আল-মান্দাব যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তার অভিঘাত ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে এশিয়া, ইউরোপ এবং বৈশ্বিক তেলবাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।