বাব আল-মান্দাব প্রণালি দখলের হুমকি দিলো হুথি, চাপে মার্কিন বাহিনী

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দিকে এগোতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক হেনরি এনশার। তার মতে, এই জলপথের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নাও থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে।

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলজেরিয়ায় সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি এনশার বলেন, ইরান-সমর্থিত হুথিরা অন্তত বাব আল-মান্দাবকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার হুমকি তৈরি করতে চায়। এর পেছনে তাদের নিজস্ব সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য যেমন রয়েছে, তেমনি তেহরানের সঙ্গে তাদের জোটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এনশারের ভাষায়, এতদিনেও হুথিরা এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেনি—এটাই বরং তার কাছে বিস্ময়কর। তার ধারণা, হুথি ও ইরান হয়তো দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পর এখন সেই সক্ষমতা ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে।

তিনি বলেন, “হয়তো ইরান ও হুথিরা নিজেদের সক্ষমতা তৈরি করছিল, এরপর তারা পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব

বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই জলপথের উত্তরে রয়েছে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল, আর দক্ষিণে এডেন উপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগরের পথ। ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর।

ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের সাম্প্রতিক সংঘাত তাই শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হুথিরা যদি বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড ও উপকূলীয় অবস্থান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, তাহলে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল বাধাগ্রস্ত করার সক্ষমতা তাদের অনেক বেড়ে যাবে।

সাম্প্রতিক সময়ে হুথিদের অগ্রযাত্রা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর তারা কৌশলগত লোহিত সাগরীয় বন্দরনগরী মোকা দখল করেছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। মোকা বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি হওয়ায় এই দখলকে হুথিদের সামুদ্রিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, পশ্চিম ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি তাদের বাব আল-মান্দাবের আরও কাছে নিয়ে গেছে। এতে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে নতুন করে বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেন কঠিন হবে

বাব আল-মান্দাবের ওপর হুমকি তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে একাধিক সামুদ্রিক ফ্রন্ট সামলাতে হতে পারে। একদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, অন্যদিকে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবে হুথি তৎপরতা—দুটি সংকট একসঙ্গে মোকাবিলা করতে গেলে মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর বড় ধরনের অপারেশনাল চাপ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই বাব আল-মান্দাব, দক্ষিণ লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মার্কিন সামুদ্রিক সতর্কতায় বলা হয়েছে, হুথিদের কাছ থেকে ড্রোন, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ছোট নৌযান এবং জাহাজে ওঠার চেষ্টাসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি থাকতে পারে।

ফলে হুথিরা যদি শুধু বিচ্ছিন্ন হামলার বদলে বাব আল-মান্দাবের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ বা নিয়মিতভাবে হুমকির মধ্যে রাখার কৌশল নেয়, তাহলে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি প্রয়োজন হতে পারে।

‘আরেক হরমুজ’ হওয়ার আশঙ্কা

ইয়েমেনের রাষ্ট্রদূত রাজেহ বাদি সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, হুথিরা যদি লোহিত সাগরের নৌচলাচল সংকুচিত করতে সক্ষম হয়, তাহলে বাব আল-মান্দাব আরেকটি হরমুজে পরিণত হতে পারে। তার মতে, এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও পড়তে পারে।

এই আশঙ্কার পেছনে রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ভৌগোলিক সংযোগ। হরমুজ দিয়ে পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে যায়; আর বাব আল-মান্দাব দিয়ে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপের সঙ্গে এশিয়ার বাণিজ্যিক যোগাযোগ বজায় থাকে।

একটি পথ দীর্ঘ সময় অচল হলে জাহাজকে ঘুরপথে যেতে হয়। এতে যাত্রার সময় ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে, একই সঙ্গে তেল, গ্যাস ও অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে।

ইরানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

হেনরি এনশারের বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরান ও হুথিদের সম্পর্ক। তিনি মনে করেন, হুথিরা শুধু নিজেদের স্বার্থে নয়, তেহরানের সঙ্গে জোটের অংশ হিসেবেও বাব আল-মান্দাবকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

তবে ইরান সরাসরি হুথিদের প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে—এমন দাবিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। ইরান হুথিদের সমর্থন করে এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তার অভিযোগ দীর্ঘদিনের; কিন্তু হুথিদের প্রতিটি অভিযান তেহরানের সরাসরি নির্দেশে পরিচালিত হয় কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যেও ইরান সরাসরি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

তারপরও ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলে যাচ্ছে। মোকা দখল এবং পশ্চিম উপকূলে হুথিদের অগ্রযাত্রা তাদের লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

ফলে এনশারের সতর্কবার্তা এখন আর কেবল সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির কথা নয়। বাব আল-মান্দাবের আশপাশে হুথিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রগতি সেই আশঙ্কাকে বাস্তব নিরাপত্তা প্রশ্নে পরিণত করেছে। আর যদি এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী নৌ-হুমকি তৈরি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সময়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—দুই গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্টের নিরাপত্তা নিয়ে লড়তে হতে পারে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন