ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের সাম্প্রতিক সাফল্যকে ‘ঐশ্বরিক বিজয়’ হিসেবে প্রশংসা করেছে ইরান। দেশটির সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম হুথিদের একের পর এক সামরিক সাফল্যকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করার কোনো ঘোষণা এখনো দেয়নি তেহরান।
হুথিরা চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কয়েকটি শহর ও দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর মধ্যে শুক্রবার গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করে তারা। এর ফলে ইয়েমেনের সরকার লোহিত সাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার হারিয়েছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
হুথিদের এই অগ্রগতির ফলে বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণও বেড়েছে। ইয়েমেনের মূল ভূখণ্ডের মাত্র প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মায়ুন বা পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের কাছে হুথিদের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, পশ্চিম উপকূলে আনসারুল্লাহর জয় ‘ঐশ্বরিক বিজয়ের’ গল্প এবং কঠিন যুদ্ধক্ষেত্রে বছরের পর বছর দৃঢ়তার ফল।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও হুথিদের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন। তিনি সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ২০২৪ সালের একটি বক্তব্য পুনরায় প্রকাশ করে বলেন, হুথিদের ‘প্রতিরোধ’ শেষ পর্যন্ত বিজয় এনে দেবে।
ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফও হুথিদের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি অঞ্চলটির দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ঐক্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবেরও হুথিদের ‘বড় বিজয়’কে স্বাগত জানিয়েছেন। ইরানের কট্টরপন্থী গণমাধ্যমগুলোও হুথিদের সাফল্যকে ব্যাপকভাবে প্রচার করছে। একটি পত্রিকা এই অগ্রগতিকে ‘প্রতিরোধের অলৌকিক ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বাব আল-মান্দাব নিয়ে কী বলছে হুথিরা?
হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে হুথিরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালিটি বন্ধ ঘোষণা করেনি।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি শুক্রবার বলেছেন, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া সব কোম্পানির জন্য সমুদ্রপথে চলাচল নিরাপদ। অর্থাৎ সৌদি জাহাজগুলোকে তারা এখনো অবরোধের আওতায় রাখছে।
হুথিদের হাতে লোহিত সাগর উপকূল ও কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ যাওয়ায় বাব আল-মান্দাবের ওপর তাদের চাপ তৈরির সক্ষমতা বেড়েছে। একটি ভিডিওতে হুথিদের এক কমান্ডারকে বলতে দেখা গেছে, জাহাজে হামলার জন্য এখন আর শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের প্রয়োজন হবে না; উপকূলে কামান বসিয়েও জাহাজ লক্ষ্য করা সম্ভব। তবে ইরান এখনো হুথিদের এই অগ্রগতিকে সরাসরি বাব আল-মান্দাব বন্ধের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করেনি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরং বলেছে, হুথিরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়। তাদের দাবি, ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের অবরোধ এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক উদ্যোগে সমাধান না আসার কারণেই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইয়েমেনে যা ঘটছে, তা দীর্ঘদিনের অবরোধের কারণে ইয়েমেনিদের ধৈর্য হারানোর ফল। তেহরান হুথিদের শুধু ইরানের ‘প্রক্সি’ হিসেবে দেখার ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ও বাব আল-মান্দাবের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়লে তেহরানের জন্য এটি কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। আরব উপদ্বীপের অন্য পাশে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ফলে একদিকে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ চলছে, অন্যদিকে বাব আল-মান্দাবের কাছে হুথিদের সামরিক অবস্থান শক্ত হচ্ছে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেই অস্থিরতা বাড়লে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
তবে আপাতত তেহরান বাব আল-মান্দাব বন্ধের কোনো ঘোষণা দেয়নি। বরং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে সোমবার আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান।
সূত্র: আলজাজিরা