সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাব্য চুক্তিতে অনুমোদনের পথ খুলে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এই প্রতিরক্ষা প্যাকেজে যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি ইঞ্জিন, যোগাযোগ সরঞ্জাম, খুচরা যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি; মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনা বাকি রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সম্ভাব্য বিক্রির বিষয়ে কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করে। প্রস্তাবিত প্যাকেজে ৪৮টি লকহিড মার্টিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং ৪৯টি প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি এফ১৩৫ ইঞ্জিনের পাশাপাশি যোগাযোগ সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ ও লজিস্টিক সহায়তা রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই অনুমোদনকে সরাসরি বিমান সরবরাহের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে না। সম্ভাব্য বিক্রিটি এখন কংগ্রেসের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। চুক্তি চূড়ান্ত হলেও বিমান সরবরাহে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটনে যে উদ্বেগ রয়েছে, এ চুক্তিকে ঘিরে তা আবার সামনে এসেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কার অন্যতম বিষয় হলোসৌদি সামরিক অবকাঠামোয় চীনের প্রবেশাধিকার ও দুই দেশের বাড়তে থাকা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে অত্যাধুনিক মার্কিন প্রযুক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এফ-৩৫ শুধু একটি যুদ্ধবিমান নয়; এর সঙ্গে উন্নত সেন্সর, সফটওয়্যার, যোগাযোগ ও তথ্য-সমন্বয় ব্যবস্থা যুক্ত রয়েছে। ফলে বিমানটির প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদেশে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনগত ও কৌশলগত পর্যালোচনা করা হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, প্রস্তাবিত বিক্রি সৌদি আরবের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াবে, নিজস্ব প্রতিরক্ষা জোরদার করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের সঙ্গে দেশটির সামরিক আন্তঃকার্যক্ষমতা উন্নত করবে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের দাবি, এই বিক্রির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসবে না।
চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে সৌদি আরব হবে এফ-৩৫ পরিচালনাকারী প্রথম আরব দেশ। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে শুধু ইসরায়েলের কাছেই এই যুদ্ধবিমান রয়েছে। ফলে রিয়াদের হাতে এফ-৩৫ যাওয়ার সম্ভাবনা ইসরায়েলের সামরিক প্রাধান্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক নীতির প্রশ্নও সামনে আনছে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বা সামরিক প্রযুক্তিগত প্রাধান্য বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছে। সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত সেই নীতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্য রাখা হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই এফ-৩৫ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। ২০২৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার বিষয়ে সমর্থনের কথা জানিয়েছিলেন। এবার পররাষ্ট্র দপ্তরের আনুষ্ঠানিক নোটিফিকেশনের মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য চুক্তিটি আরও এক ধাপ এগোল।
তবে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি কার্যকর হবে কি না, তার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং মার্কিন সংবেদনশীল প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোও সামনে থাকবে।
সব মিলিয়ে, ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য এফ-৩৫ চুক্তিটি শুধু সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক প্রাধান্য এবং চীনের সঙ্গে সৌদি আরবের বাড়তে থাকা সম্পর্কতিনটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়ও জড়িয়ে রয়েছে।