ভবিষ্যতের যুদ্ধ আর শুধু স্থল, আকাশ কিংবা সমুদ্রের প্রচলিত সীমায় আটকে থাকবে না। যুদ্ধের সম্ভাব্য ক্ষেত্র বিস্তৃত হতে পারে সমুদ্রের গভীর তলদেশ থেকে শুরু করে পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যবর্তী মহাকাশ পর্যন্ত। এমন বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে নতুন ধরনের যুদ্ধপরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত Air, Space and Cyber Conference-এ বক্তব্য দিতে গিয়ে জেনারেল কেইন বলেন, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের পরিধি দ্রুত বাড়ছে। সমুদ্রের তলদেশ থেকে পৃথিবীর কক্ষপথ পেরিয়ে ‘সিসলুনার স্পেস’—অর্থাৎ পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যবর্তী মহাকাশও ভবিষ্যতের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠছে।
তার ভাষ্য, পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখনই মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা ও কৌশলে পরিবর্তন আনতে হবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে যৌথ বাহিনীকে যুদ্ধ করা, টিকে থাকা এবং কার্যকরভাবে অভিযান পরিচালনার উপযোগী করে তুলতে হবে।
জেনারেল কেইন সতর্ক করে বলেন, অতীতে সামরিক পরিকল্পনায় যেসব ধারণাকে প্রায় নিশ্চিত ধরে নেওয়া হতো, ভবিষ্যতের যুদ্ধে সেগুলোর অনেকটাই আর কার্যকর নাও হতে পারে। নিরাপদ সরবরাহব্যবস্থা, নির্বিঘ্ন রসদ পরিবহন কিংবা শত্রুর আক্রমণের আওতার বাইরে থাকা সামরিক ঘাঁটির মতো সুবিধা ভবিষ্যতে সহজলভ্য থাকবে না।
তার মতে, যুদ্ধের সম্মুখসারিতে থাকা ইউনিটগুলোকে এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করতে হবে, যেখানে তাদের গতিবিধি দ্রুত শনাক্ত হতে পারে, যোগাযোগব্যবস্থা জ্যামিংয়ের শিকার হতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের ওপর নজরদারি বা লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে।
কেইন বলেন, ভবিষ্যতের সংঘাতে যে পক্ষ আগে পরিস্থিতি দেখতে, তথ্য বিশ্লেষণ করে বুঝতে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারবে, তারাই কৌশলগত সুবিধা অর্জন করতে পারে।
এই বাস্তবতায় বিভিন্ন মাত্রার সামরিক সক্ষমতাকে একত্র করে দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল একটি ‘হাই-লো মিক্স’ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ উচ্চপ্রযুক্তির অত্যাধুনিক সক্ষমতার পাশাপাশি তুলনামূলক কম ব্যয় ও সহজে মোতায়েনযোগ্য ব্যবস্থাকেও সামরিক পরিকল্পনার অংশ করার কথা বলেছেন তিনি।
এর কয়েক দিন আগে মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন দেশটির বিমানবাহিনীর সেক্রেটারি ট্রয় মেইঙ্ক। তিনি জানান, মার্কিন Space Force কক্ষপথে থাকা দেশটির সামরিক সম্পদকে সম্ভাব্য শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড থেকে সুরক্ষিত রাখতে ‘space control weapons’ পরিচালনা করে।
কক্ষপথে অস্ত্রসজ্জিত মার্কিন প্ল্যাটফর্মের উপস্থিতি নিয়ে এটি ওয়াশিংটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে মহাকাশ সক্ষমতা নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ার মধ্যেই এমন তথ্য সামনে এসেছে।
এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীনও। বেইজিং মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির সমালোচনা করে বলেছে, মহাকাশকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার বিরোধী তারা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে চীন।
তবে আন্তর্জাতিক আইনে মহাকাশে সব ধরনের অস্ত্র মোতায়েন সরাসরি নিষিদ্ধ নয়। ১৯৬৭ সালের Outer Space Treaty মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র স্থাপন নিষিদ্ধ করেছে। তবে কক্ষপথে প্রচলিত বা conventional অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়ে একই ধরনের সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই।
জেনারেল কেইনের বক্তব্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও সাইবার সক্ষমতাও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তার মতে, অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তির তুলনায় AI এবং উন্নত সাইবার প্রযুক্তি যুদ্ধের ধরন সবচেয়ে দ্রুত বদলে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, AI এখন আর কেবল ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রযুক্তি নয়; ইতোমধ্যে এটি সামরিক বাহিনীর তথ্য সংগ্রহ, লক্ষ্য শনাক্তকরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অভিযান পরিচালনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে।
এর উদাহরণ হিসেবে জুন মাসে ওমানের উপকূলের কাছে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন কেইন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি Apache attack helicopter বিধ্বস্ত হওয়ার পর AI-নিয়ন্ত্রিত একটি স্বয়ংক্রিয় নৌযান মার্কিন দুই সেনাকে উদ্ধারে সহায়তা করে। সামরিক অভিযানে মানুষের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ব্যবহার কীভাবে বাড়ছে, ঘটনাটিকে তার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
হরমুজ প্রণালি থেকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত বিভিন্ন সামরিক অভিজ্ঞতার কথাও বক্তব্যে তুলে ধরেন জেনারেল কেইন। তার মতে, এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে যুদ্ধের ধরনও কীভাবে বদলে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় ভবিষ্যৎ যুদ্ধের ধারণা ক্রমেই প্রচলিত সীমারেখা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অস্ত্র ও সেনাসংখ্যার পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ, সেন্সর প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সক্ষমতা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তির সমন্বয়ই আগামী দিনের সামরিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
মিনাব ও লামার্ডে হামলা ভুল নয় যুদ্ধাপরাধ: গারিবাবাদি
‘ইরানের জন্য আত্মত্যাগ’ সমাবেশ ঐক্য ও সংহতির প্রতীক: পেজেশকিয়ান
গোপনে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছেন আহমেদ আল-শারা