ইরানি ব্যাংকের লাইসেন্স বাতিল করলো তুরস্ক

ইরানের ব্যাংক মেল্লাতের লাইসেন্স বাতিল করেছে তুরস্ক। দেশটির সরকারি গেজেটে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। মূলত তেহরানভিত্তিক ব্যাংকটির ইস্তাম্বুল শাখার কার্যক্রমের অনুমতিই বাতিল করা হয়েছে।

ব্যাংক মেলাত একটি আধা-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যার ওপর বহু বছর ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইরানের সরকার ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য নিয়ে কাজ করা উন্মুক্ত ডেটাবেস ‘ওপেনসাংশনের’ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটি ইরান সরকারকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে।

তুরস্কের ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড সুপারভিশন এজেন্সি (বিডিডিকে) ব্যাংকটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারি গেজেটে বলা হয়েছে, তুরস্কের ব্যাংকিং আইনের ৭১(বি) ধারার আওতায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা আমানতকারী ও অংশগ্রহণ তহবিলের মালিকদের অধিকার এবং আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হলে তার লাইসেন্স বাতিল করা যেতে পারে।

তবে ব্যাংক মেল্লাতের লাইসেন্স বাতিলের সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে তুরস্কের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। তবে সময়ের হিসাবে দুটি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, তুরস্কের সিদ্ধান্তের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে কথিত সম্পর্কের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র একটি তুর্কি ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

ব্যাংক মেল্লাতের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ইতিহাসও দীর্ঘ। ইরান বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির আড়ালে পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে- এমন অভিযোগের ভিত্তিতে বহু বছর ধরে ব্যাংকটির ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ২০১৫ সালে তেহরান ও বিশ্বের কয়েকটি শক্তিধর দেশের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়। ওই চুক্তির অংশ হিসেবে ব্যাংক মেল্লাতের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের মে মাসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে ওই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। একই সঙ্গে ইরানের ওপর আবারও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন। এরপর ২০১৯ সালে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৫টি প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকায় ব্যাংক মেল্লাতের নামও যুক্ত করা হয়। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞারও মুখে পড়ে ব্যাংকটি।

ইরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের মধ্যেই তুরস্কের ব্যাংক মেল্লাতের লাইসেন্স বাতিলের ঘটনা ঘটলো। ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর এই অভিযানের বিষয়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ ঘোষণা করেছে। যারা এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দেবে না, তাদের জন্য কঠোর পরিণতির সতর্কতাও দিয়েছেন তিনি।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ যখন তীব্র হচ্ছে, তখন ন্যাটোর সদস্য তুরস্কের ব্যাংক মেল্লাতের লাইসেন্স বাতিলের ঘটনা আঙ্কারার ওপর ওয়াশিংটনের চাপের প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে তুরস্কের সরকারি সিদ্ধান্তে মার্কিন চাপকে সরাসরি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
সূত্র: এএফপি