যুদ্ধ ও দমন-পীড়নের মূল্য দিচ্ছে ইরানের মানুষ: নোবেলজয়ী নার্গেস মোহাম্মাদি

ইরানে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের চাপে সাধারণ মানুষ ‘নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা’ হারাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মানবাধিকারকর্মী নার্গেস মোহাম্মাদি।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গত দেড় বছরের যুদ্ধ ও চলমান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন ইরানিদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। তাঁর ভাষায়, ‘চরম মূল্য দিচ্ছে মানুষই।’

২০২৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া ৫৪ বছর বয়সী মোহাম্মাদি বলেন, যুদ্ধের সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক দমন-পীড়নও বেড়েছে। তবে এসবের মধ্যেও ইরানের তরুণ প্রজন্ম নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

‘রাস্তায় গেলে মানুষের মধ্যে প্রতিরোধের ঢেউ, সচেতনতার ঢেউ এবং নিজেদের অধিকারের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার দৃঢ়তা দেখা যায়’—এপি-কে বলেন তিনি। তাঁর মতে, সরকারের দমন-পীড়ন বাড়লেও নতুন প্রজন্মের অনেকেই নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানে এবং অবস্থান ধরে রেখেছে।

ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন মোহাম্মাদি। তিনি বলেন, সেই সময়কার দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর অভিযান এবং কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের স্মৃতি তাঁর মধ্যে যুদ্ধের প্রতি গভীর বিরূপতা তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, ইভিন কারাগারসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে সংঘটিত দমন-পীড়নের স্মৃতি তিনি ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন।

২০২৫ সালে ইসরায়েল-ইরান ১২ দিনের যুদ্ধের সময় তেহরানের ইভিন কারাগারে হামলার খবর শুনেও তিনি উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, তখন মনে হয়েছিল ইরান যেন ‘অন্যায়, বৈষম্য, যুদ্ধ ও কর্তৃত্ববাদের সংযোগস্থলে’ দাঁড়িয়ে আছে এবং এসবই মানুষের মানবাধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সাক্ষাৎকারে নিজের সর্বশেষ গ্রেপ্তার ও কারাবাসের অভিজ্ঞতাও বর্ণনা করেন মোহাম্মাদি। তাঁর দাবি, গত ডিসেম্বরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে গ্রেপ্তারের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাকে মারধর করেন।

মানবাধিকার আইনজীবী খসরু আলিকুরদির স্মরণসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে তিনি জানান। পরে ওই সমাবেশে অংশ নেওয়ার ঘটনায় তাকে ১৬ বছরের কারাদণ্ড ও ১০০টির বেশি বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত তাকে বেত্রাঘাত করা হয়নি বলে তিনি জানান।

মোহাম্মাদি বলেন, মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ার পরও তাকে প্রায় দুই মাস একাকী কারাবাসে রাখা হয়েছিল। ১ মে তিনি জ্ঞান হারালে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রায় ১০ দিন পর জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি তেহরানের একটি হাসপাতালে আরও দুই সপ্তাহ চিকিৎসা নেন। বর্তমানে তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠছেন বলে জানিয়েছেন।

কারাগারে থাকা অবস্থায় লেখা তাঁর স্মৃতিকথা ‘A Woman Never Stops Fighting’ চলতি মাসে কয়েকটি ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে। বইটির কিছু অংশ সহবন্দিদের সহায়তায় কারাগার থেকে বাইরে পাঠানো হয়েছিল।

ফরাসি, জার্মানসহ বেশ কয়েকটি ভাষার সংস্করণ চলতি মাসে প্রকাশিত হচ্ছে। ইংরেজি ও ফারসি সংস্করণ আগামী বছর প্রকাশের কথা রয়েছে। তাঁর প্রতিনিধিদের মতে, বইটি ২০২২ সালের বিক্ষোভে নিহত মাহসা আমিনির স্মৃতির প্রতিও শ্রদ্ধা জানায়।

মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ২০২২ সালে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। মোহাম্মাদি মনে করেন, সেই আন্দোলনের পর ইরানের নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা আরও বেড়েছে।

মোহাম্মাদির বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলায় দেওয়া সাজা মিলিয়ে মোট ৪৪ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে বলে এপি জানিয়েছে। তিনি ইতোমধ্যে প্রায় ১০ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন, যার মধ্যে ১৬১ দিন একাকী কারাবাসে ছিলেন।

২০০৯ সাল থেকে তার বিদেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাঁর স্বামী ও দুই সন্তান ফ্রান্সে নির্বাসিত অবস্থায় থাকায় তাদের সঙ্গেও তিনি থাকতে পারছেন না।

বর্তমানে তাঁর সাজা স্থগিত রয়েছে। তবে ইরানের বিচার বিভাগ নির্দেশ দিলে তাকে আবার কারাগারে ফিরতে হতে পারে বলে তিনি এপিকে জানিয়েছেন।

যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও দমন-পীড়নের এই পরিস্থিতির মধ্যেও মোহাম্মাদি ইরানের মানুষের প্রতিরোধ ও অধিকার সচেতনতার মধ্যে আশার জায়গা দেখছেন। তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে যুদ্ধের মানবিক মূল্য এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দমন-পীড়নের প্রভাব উঠে এসেছে।