রিয়াদে হুথিদের হামলা, ইরানকে দায়ী করলো ইয়েমেন

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৯ এএম

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হুথিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার। একই সঙ্গে হুথিদের সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্য ইরানকেও দায়ী করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রিয়াদে হামলার প্রচেষ্টাকে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের ‘নির্লজ্জ লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করে। হুথিদের হামলার জন্য সরাসরি তাদের দায়ী করে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় রিয়াদ এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট যে পদক্ষেপ নেবে, তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে সানা-ভিত্তিক নয়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার।

ইয়েমেন সরকার বলেছে, হুথিদের হামলা শুধু সৌদি ভূখণ্ডের জন্য নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্যও হুমকি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি হুথিদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

শনিবার ভোরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, হুথিরা রিয়াদ লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেটি শনাক্ত করে আকাশেই ধ্বংস করেছে বলে দাবি করা হয়।

এরপর রিয়াদের কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। রাজধানীর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে কালো ধোঁয়ার বড় কুণ্ডলীও দেখা যায়। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, তারা রিয়াদের ‘সংবেদনশীল’ স্থাপনা এবং ইয়ানবুতে সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোর একটি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

সৌদি জোট আরও জানিয়েছে, বিশা, তাইফ, ফারাসান ও ইয়ানবুতেও বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে।

ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হুথিদের সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখা ও হামলা চালিয়ে যাওয়ার পেছনে ইরানের সমর্থন রয়েছে। তাদের অভিযোগ, ইরান আঞ্চলিক রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য হুথিদের সামরিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

তবে এটি ইয়েমেন সরকারের একটি রাজনৈতিক অভিযোগ। হুথিদের সামরিক সক্ষমতা ও ইরানের সহায়তার মাত্রা নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে তথ্য থাকলেও নির্দিষ্ট এই হামলার নির্দেশ বা সরাসরি পরিচালনায় ইরানের ভূমিকার স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই অবশ্য সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তেহরান সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার যুদ্ধের অবসান চায়। একই সময়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় যাওয়ার জন্য কাতার ও পাকিস্তানের মাধ্যমে কূটনৈতিক যোগাযোগও চালিয়ে যাচ্ছে।

রিয়াদে হামলার পর ইয়েমেনের পাশাপাশি মিসর, জর্ডান, বাহরাইন এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC) সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। জর্ডান ও বাহরাইন হামলাকে সৌদি সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং বেসামরিক স্থাপনার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার নিন্দা করেছে। বিশেষ করে বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পরিষদ।

রিয়াদে হামলার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইয়েমেনের ভেতরেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও হুথিদের মধ্যে লড়াই নতুন করে তীব্র হয়েছে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে। অন্যদিকে হুথিরা রাজধানী সানা ও দেশের জনবহুল উত্তরাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগরের উপকূল ও বাব আল-মান্দেব ঘিরে সংঘাত আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হওয়ায় ইয়েমেনের নতুন করে তীব্র হওয়া যুদ্ধের প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তার বাইরে বৈশ্বিক বাণিজ্যেও পড়তে পারে।

রিয়াদে হুথিদের হামলার চেষ্টা তাই ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বাইরে সৌদি আরব, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

এএম
আরও পড়ুন