ইয়েমেনে আবারও জ্বলে উঠেছে দীর্ঘদিনের যুদ্ধের আগুন। দেশের পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে তাইজ ও লাহজ প্রদেশের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। গোলাবর্ষণ, ড্রোন ও বিমান হামলার পাশাপাশি স্থলযুদ্ধে ব্যাপক হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দিনের লড়াইয়ে কোনো পক্ষই এমন বড় সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, যা যুদ্ধের সামগ্রিক গতিপথ বদলে দিতে পারে। বরং মোখা ও বাব আল-মান্দাবের দিকে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রার পর যুদ্ধ এখন গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি অবস্থান দখল ও ধরে রাখার লড়াইয়ে আটকে পড়েছে।
মোখা দখলের পর কেন থমকে গেল হুথিদের অগ্রযাত্রা?
সেপ্টেম্বরের শুরুতে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। হুথি বাহিনী ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লোহিত সাগর উপকূল ধরে এগিয়ে এসে ১০ সেপ্টেম্বর কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল করে। পরদিন তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত মায়ুন বা পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের খুব কাছাকাছি হুথিদের সামরিক উপস্থিতি তৈরি হয়। জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গও মোখার নিয়ন্ত্রণকে বাব আল-মান্দাবের স্বাধীন নৌচলাচল নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত অগ্রসর হওয়ার পর হুথিদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পাহাড়ি ভূখণ্ড। মোখা থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এগোতে হলে তাদের কাহবুবসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি উচ্চভূমি নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। এসব অবস্থান থেকে উপকূল, সড়ক এবং অভ্যন্তরীণ যোগাযোগপথ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
২০ সেপ্টেম্বরের স্থানীয় যুদ্ধক্ষেত্রের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কাহবুব পাহাড়ের দিকে কয়েক দিন ধরে ভয়াবহ সংঘর্ষ হলেও হুথিরা সেখানে পূর্বদিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারেনি। সরকারি বাহিনী বিমান, ড্রোন ও রকেট হামলার সহায়তায় হুথিদের একাধিক আক্রমণ প্রতিহত করছে।
তাইজ–লাহজ এখন প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র
বর্তমানে সবচেয়ে তীব্র লড়াই চলছে দক্ষিণ-পশ্চিম তাইজের আল-কাধা ও আল-ওয়াজিয়াহ এবং লাহজের কাহবুব পাহাড় এলাকায়। উভয় পক্ষই অতিরিক্ত সেনা ও অস্ত্রশস্ত্র এনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সামরিক সূত্রের হিসাবে, ২৪ ঘণ্টার লড়াইয়ে অন্তত ৪৪ জন নিহত হয়েছেন। আল-কাধা ও আল-ওয়াজিয়াহ এলাকায় সরকারি বাহিনী হুথিদের কয়েকটি আক্রমণ প্রতিহত করেছে বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে কাহবুব পাহাড়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে। তবে নিহতের সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের দেওয়া তথ্য পরস্পর থেকে আলাদা এবং স্বাধীনভাবে সব সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
যুদ্ধক্ষেত্রের এই পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, হুথিরা এখন শুধু সরাসরি আক্রমণ নয়, বিভিন্ন দিক দিয়ে সরকারি প্রতিরক্ষা ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করছে। কাহবুব পাহাড় সরাসরি দখল করা কঠিন হওয়ায় তারা পূর্বদিকের আল-আলকামাহ, আল-শারিরাহ ও অন্যান্য পাহাড়ি এলাকায় চাপ সৃষ্টি করছে। লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বল জায়গা খুঁজে বের করা এবং কাহবুবকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া।
সরকারি বাহিনীর সমস্যাও কম নয়
হুথিদের অগ্রযাত্রা থামাতে সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্ররা বিমান হামলা এবং ভারী অস্ত্র ব্যবহার করছে। কিন্তু তাদের অন্যতম বড় সমস্যা হলো কমান্ড কাঠামোর বিভাজন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থনকারী বাহিনী একক সামরিক কাঠামোর অধীনে কাজ করে না; বিভিন্ন স্থানীয় ও আঞ্চলিক বাহিনীর নিজস্ব নেতৃত্ব, রাজনৈতিক স্বার্থ ও সামরিক অগ্রাধিকার রয়েছে।
আল জাজিরার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ইয়েমেনের সরকারপন্থী বাহিনীর বিভক্ত কমান্ডকে হুথিদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কোনো একটি ফ্রন্টে সাফল্য এলেও সেটিকে দ্রুত অন্য এলাকায় কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে হুথিরাও নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা বিভিন্ন ফ্রন্টে পাঠাচ্ছে। ফলে যুদ্ধটি এখন একক কোনো শহর দখলের লড়াই না থেকে বিস্তৃত ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হচ্ছে।
মারিবেও নতুন চাপ
পশ্চিমাঞ্চলের যুদ্ধের পাশাপাশি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ মারিবেও সংঘর্ষ বেড়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ মারিবের আল-ফালিহা এলাকায় হুথিদের একটি অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে এবং ১২ জন হুথি যোদ্ধা নিহত হয়েছে। হুথিরা মারিবের চারপাশে যোদ্ধা ও উপজাতীয় মিত্রদের জড়ো করছে বলে সরকারি সূত্র দাবি করেছে।
মারিবের গুরুত্ব শুধু ভৌগোলিক নয়; ইয়েমেনের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর জন্যও অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই পশ্চিম উপকূলে হুথিদের চাপের পাশাপাশি মারিবে নতুন ফ্রন্ট খোলা হলে সরকারি বাহিনীকে একাধিক দিকে শক্তি ভাগ করতে হবে।
বাব আল-মান্দাব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইয়েমেনের বর্তমান যুদ্ধকে শুধু গৃহযুদ্ধ হিসেবে দেখলে এর আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বোঝা যাবে না। বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হওয়ায় এই সংকীর্ণ জলপথে সামরিক নিয়ন্ত্রণ বা হামলার ঝুঁকি বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণেই মোখা ও মায়ুনে হুথিদের অগ্রযাত্রা সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সৌদি বাহিনী হুথি অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে, আর হুথিরাও সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব জানিয়েছে, রিয়াদ লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। হুথিরা সৌদি তেল অবকাঠামোসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করলেও সব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধ আবারও আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে বাব আল-মান্দাবেও অস্থিরতা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ
যুদ্ধের সামরিক হিসাবের বাইরে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে বেসামরিক মানুষের জীবনে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের হিসাবে, সেপ্টেম্বরের নতুন সংঘাতে মাত্র দুই সপ্তাহে ইয়েমেনের ভেতরে অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রায় ৩ হাজার মানুষ সমুদ্রপথে পালিয়ে জিবুতিতে পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের বিশেষ দূতও জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের ৩ তারিখ থেকে দেশজুড়ে ১১ হাজার ৪০০-এর বেশি পরিবার নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাইজ ও দক্ষিণ হুদাইদাহে বাস্তুচ্যুতির চাপ সবচেয়ে বেশি।
ইয়েমেন এমনিতেই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য আশ্রয়, খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সরবরাহ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
সামনে কী?
বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্রে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে হুথিরা অল্প সময়ের মধ্যে মোখা ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। অন্যদিকে বাব আল-মান্দাবের দিকে আরও পূর্বমুখী অগ্রযাত্রায় কাহবুব ও তাইজের পাহাড়ি প্রতিরোধ তাদের গতি কমিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে সরকারি বাহিনীও হুথিদের দখল করা উপকূলীয় অঞ্চল দ্রুত পুনর্দখল করতে পারেনি। ফলে যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কয়েক কিলোমিটার ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণও বড় সামরিক ও কৌশলগত মূল্য বহন করছে।
এই অবস্থায় ইয়েমেনের যুদ্ধ দ্রুত কোনো এক পক্ষের নিরঙ্কুশ বিজয়ের দিকে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই। বরং সাম্প্রতিক লড়াইয়ের প্রবণতা বলছে, তাইজ–লাহজের পাহাড়ি ফ্রন্ট এবং মারিবের প্রতিরক্ষা রেখা আগামী দিনগুলোতে যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আর বাব আল-মান্দাব ঘিরে যেকোনো বড় পরিবর্তন ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো লোহিত সাগর ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।