ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই একধরনের ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ ঘটিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের রাজনৈতিক পরিণতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের প্রসঙ্গ তুলে এমন মন্তব্য করেছেন লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আরশিন আদিব-মোগাদ্দাম।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ইরানের সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু পশ্চিম এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নেই; এর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়কে তিনি যুদ্ধের বিস্তৃত রাজনৈতিক পরিণতির একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আদিব-মোগাদ্দাম এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল থট অ্যান্ড কম্পারেটিভ ফিলোসফিজ বিভাগের অধ্যাপক। তিনি বলেন, সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতির ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, ইরাক ও লেবাননের পরিস্থিতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক আদিব-মোগাদ্দাম যুদ্ধের নতুন প্রযুক্তিগত মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, ক্রমবর্ধমান স্বয়ংক্রিয় সামরিক প্রযুক্তি যুদ্ধকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যাকে তিনি ‘পোস্ট-হিউম্যান ওয়ারফেয়ার’ বা মানবনিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া যুদ্ধব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, সামরিক অভিযানে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার ফলে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ ধরনের প্রযুক্তি শুধু প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; মহাকাশ ও ভূগর্ভস্থ অভিযানেও এর ব্যবহার নিয়ে কাজ চলছে।
ইরানের মিনাবের একটি স্কুলে হামলার ঘটনাকে তিনি বেসামরিক মানুষের ওপর যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। ঘটনাটিকে তিনি ‘প্রকৃত যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেন। তবে এ বিষয়ে তাঁর মন্তব্যকে সাক্ষাৎকারদাতার মূল্যায়ন হিসেবে দেখতে হবে; যুদ্ধাপরাধের চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট স্বাধীন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়।
অধ্যাপক জানান, ভূগর্ভস্থ যুদ্ধের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচল করতে সক্ষম টানেল খননকারী প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগও রয়েছে। পানির নিচে সাবমেরিন যেভাবে চলাচল করে, সেভাবে পৃথিবীর ভূত্বকের নিচে চলাচলের উপযোগী প্রযুক্তি তৈরির ধারণা নিয়ে কাজ হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর আশঙ্কা, বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে এসব নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষা চালানো হতে পারে। এতে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ধরনের বিপদ তৈরি হতে পারে।
বেসামরিক মানুষের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আদিব-মোগাদ্দাম বলেন, আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে দেশগুলোর কূটনৈতিক প্রভাব ও সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতে, ইরানের কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার পেছনে ইসরায়েল ও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধিতার পাশাপাশি দেশটির নিজস্ব কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতাও দায়ী।
তিনি অভিযোগ করেন, বিদেশে অবস্থিত ইরানি দূতাবাসগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ, জনসংযোগ এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে কার্যকর ও সুপরিকল্পিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে ইরানের অবস্থান ও সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি।
অন্যদিকে, শান্তির পক্ষে কাজ করা বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, অধিকারকর্মী ও বিভিন্ন দেশের নাগরিক উদ্যোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সাধারণ মানুষের সুরক্ষা এবং দেশটির সংস্কৃতি সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরিতে কাজ করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এসব মানুষকেই ইরানের প্রকৃত রাষ্ট্রদূত হিসেবে আখ্যা দেন অধ্যাপক আদিব-মোগাদ্দাম।
ইরান যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি তেলের দাম, পণ্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
তাঁর মতে, পারস্য উপসাগরের উত্তেজনা এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে। এর প্রভাব তেলের দামের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের মূল্যস্ফীতিতেও পড়তে পারে।
তিনি বলেন, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে তরুণ প্রজন্মের বিক্ষোভ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটের যোগসূত্র রয়েছে। হামবুর্গ, বার্লিন ও বার্সেলোনায় জেনারেশন জেড বা তরুণদের বিক্ষোভ তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন বলেও জানান।
তাঁর বিশ্লেষণে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি, সামাজিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক অভিঘাতের উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা বলেন আদিব-মোগাদ্দাম। তাঁর মতে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরাজয়ের সঙ্গে যুদ্ধের সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রভাব কীভাবে এক দেশের সীমান্ত ছাড়িয়ে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পৌঁছে যায়, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তবে নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধই একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ সাক্ষাৎকারে তিনি দেননি। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনীতি, অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ ইস্যুও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে ইরানের নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন এই অধ্যাপক।
তিনি বলেন, ইরানের জনগণ দেশটির অন্যতম বড় সম্পদ। তাদের আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের পরিচয়, সংস্কৃতি ও সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ দিতে হবে।
তাঁর ভাষায়, ‘জাতীয় নিরাপত্তা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো বিষয় নয়; এটি নিচ থেকে, অর্থাৎ জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে।’
তিনি মনে করেন, শুধু সামরিক শক্তি বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নাগরিকদের প্রতিভা বিকাশ, আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে দ্রুত বদলে যাওয়া বিশ্বে ইরানের জনগণকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
হাফেজ ও ইরানি সংস্কৃতিকে বিশ্বে তুলে ধরার আহ্বান
ইরানের দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলোকে সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেন আদিব-মোগাদ্দাম।
তিনি বলেন, বিদেশে ইরানি সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং মানসম্মত কনটেন্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
এ ক্ষেত্রে কবি হাফেজের সাহিত্য ও ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাবও দেন তিনি।
তাঁর মতে, একটি দেশের জনগণের আন্তর্জাতিক কণ্ঠস্বর যত শক্তিশালী হবে, তাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রও তত বিস্তৃত হবে। ভবিষ্যতের যুদ্ধ প্রতিরোধে সাংস্কৃতিক কূটনীতি হতে পারে প্রতিরক্ষার প্রথম স্তর।
কে এই আরশিন আদিব-মোগাদ্দাম
আরশিন আদিব-মোগাদ্দাম লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল থট অ্যান্ড কম্পারেটিভ ফিলোসফিজ বিভাগের অধ্যাপক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির সেন্টার ফর এআই ফিউচারস এবং সেন্টার ফর ইরানিয়ান স্টাডিজের সহপরিচালক।
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস ও ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি প্রেসের দুটি বইয়ের সিরিজের সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত তিনি। তাঁর সাম্প্রতিক বই দ্য মিথ অব গুড এআই: আ ম্যানিফেস্টো ফর ক্রিটিক্যাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রকাশিত হয়েছে ২০২৫ সালে।
সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি
সোনার দামে বড় লাফ, ভরিতে বাড়লো ৫৪৮২ টাকা
প্রাথমিক শিক্ষায় আসছে নতুন মনিটরিং নীতিমালা: ববি হাজ্জাজ
আইজেনকট ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী!
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলো জঘন্যতম যুদ্ধাপরাধের সাফাইদাতা: বাঘাই