সার সংকট থেকে কী শুরু হতে পারে ‘ক্ষুধাযুদ্ধ’?

বিশ্ব কি নতুন এক সংকটের দিকে এগোচ্ছে—যেখানে যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র হবে বন্দুক বা ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং খাদ্য ও কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সার?

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও বাণিজ্যপথের অনিশ্চয়তা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সারবাজারে বড় চাপ তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বৈশ্বিক সার মূল্যসূচক এক প্রান্তিকের তুলনায় ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এপ্রিল নাগাদ সূচকটি ২০২২ সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালে সার মূল্যসূচক ৩০ শতাংশের বেশি বাড়ার পূর্বাভাসও দিয়েছিল।

অর্থাৎ, সংকটটি শুধু কৃষকের খরচ বাড়ার বিষয় নয়। সার সরবরাহ দীর্ঘদিন ব্যাহত হলে এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি উৎপাদন, খাদ্যের দাম, মূল্যস্ফীতি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তায়।

বর্তমান সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সার ও সার উৎপাদনের কাঁচামাল পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে অস্থিরতা।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি এখন বড় উদ্বেগের জায়গা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা—FAO-এর মহাপরিচালক কু দংইউ জানিয়েছেন, হরমুজ দিয়ে বৈশ্বিক সার রপ্তানির প্রায় ২০–৩০ শতাংশ এবং সালফারের প্রায় ৫০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। তাঁর ভাষায়, হরমুজ সংকটকে শুধু আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না; এটি বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কারণ সালফার ও অ্যামোনিয়ার মতো উপাদান বিভিন্ন ধরনের সার তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। আবার নাইট্রোজেনভিত্তিক সার, বিশেষ করে ইউরিয়া উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও জ্বালানি।

ফলে সমুদ্রপথে বাধা তৈরি হলে একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, সরবরাহ কমতে পারে এবং উৎপাদন খরচও বাড়তে পারে।

কৃষকের কাছে এক বস্তা ইউরিয়া হয়তো শুধু একটি কৃষি উপকরণ। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে একটি বিশাল আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও শিল্পব্যবস্থা।

প্রাকৃতিক গ্যাস ইউরিয়া উৎপাদনের প্রধান কাঁচামালগুলোর একটি। ফলে গ্যাসের দাম বাড়লে ইউরিয়া উৎপাদনের খরচও বাড়ে। বিশ্বব্যাংক বলছে, হরমুজ সংকটের কারণে নাইট্রোজেনভিত্তিক সার উৎপাদনের ওপর ব্যয়গত চাপ বেড়েছে। এপ্রিল মাসে ইউরিয়ার দাম প্রতি টন ৮৫০ ডলারের ওপরে উঠে যায়—ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি।

তবে বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও এখানে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যাহত হলেও বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ বাড়ানো এবং স্থলপথে কিছু বাণিজ্য ঘুরিয়ে দেওয়ার কারণে সংকটের প্রভাব কিছুটা কমানো গেছে। ফলে একটি বৈশ্বিক সার-ধস এখনো ঘটেনি।

ধরা যাক, একজন কৃষক স্বাভাবিক সময়ে ১০০ কেজি সার ব্যবহার করেন। দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি যদি মাত্র ৭০ কেজি কিনতে পারেন, তাহলে তার জমির উৎপাদন কতটা কমবে—এটি ফসল, মাটি, আবহাওয়া, সেচ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের ওপর নির্ভর করবে।

তবে সার ব্যবহারে বড় ধরনের ঘাটতি হলে ফলন কমার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে নাইট্রোজেনের ঘাটতি ফসলের বৃদ্ধি ও উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণেই FAO বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বব্যাপী খাদ্য শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বরং সার ও কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা।

চীনও কি সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে?

চীন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সার উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের একটি। তাই চীনের রপ্তানি নীতির পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে চীনের সম্ভাব্য রপ্তানি সীমাবদ্ধতা বৈশ্বিক সারবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে একই সময়ে চীন কিছু বাজারে রপ্তানি বাড়িয়েছেও—অর্থাৎ পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘চীন সার রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে’ হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না।

বরং বাস্তবতা হলো—বাজারের দেশগুলো নিজেদের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা কঠোর করছে।

বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি আরও বড়

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সার সংকটের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটি তার মোট সার চাহিদার ৮৫ শতাংশের বেশি আমদানি করে। বিশ্বব্যাংক বলছে, আমন ও বোরো—এই দুটি মৌসুমে দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ হয়।

এ কারণেই হরমুজ সংকট ও বৈশ্বিক সারবাজারের অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশে সরাসরি পড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশকে খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে মোট ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের দুটি জরুরি প্রকল্প অনুমোদন করে। এর মধ্যে ৩০ কোটি ডলারের Emergency Support for Food Security Project থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন গুরুত্বপূর্ণ সার আমদানির অর্থায়ন করা হবে। এই সার আমন ও বোরো মৌসুমের জন্য ব্যবহারের কথা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক স্পষ্টভাবে বলেছে, বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা আমন ও বোরো মৌসুমের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং সার সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

‘ক্ষুধাযুদ্ধ’ কি সত্যিই শুরু হয়ে গেছে?

‘হাঙ্গার ওয়ার’ বা ‘ক্ষুধাযুদ্ধ’ শব্দটি পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু এটিকে এখনই একটি প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক যুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করার মতো তথ্য নেই।

বরং যে ঝুঁকিটি বাস্তব, সেটি হলো খাদ্য ও কৃষি উপকরণের ভূরাজনীতি।

যুদ্ধের কারণে কোনো একটি অঞ্চল থেকে সার সরবরাহ কমে গেলে অন্য দেশগুলো বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজবে। বড় উৎপাদক দেশগুলো নিজেদের কৃষকদের জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে রপ্তানি সীমিত করতে পারে। আমদানিনির্ভর দেশগুলো তখন বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হতে পারে।

এই প্রতিযোগিতা দীর্ঘ হলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে দরিদ্র ও আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর।

তবে সাম্প্রতিক তথ্য এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যও দেখাচ্ছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজ দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর ইউরিয়া রপ্তানি ৮৫ শতাংশ কমলেও বিশ্বব্যাপী মোট সার আমদানি প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। মিসর ও নাইজেরিয়ার মতো বিকল্প সরবরাহকারীরা রপ্তানি বাড়িয়েছে।

অর্থাৎ বিশ্ববাজার এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। কিন্তু সংকটের চরিত্র বদলেছে—সার পাওয়া যাবে কি না, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে, কত দামে পাওয়া যাবে।

সবচেয়ে বড় বিপদ কোথায়?

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চমূল্য। সার যদি এত ব্যয়বহুল হয়ে যায় যে দরিদ্র দেশের কৃষক প্রয়োজনীয় পরিমাণ কিনতে না পারেন, তাহলে উৎপাদন কমার ঝুঁকি বাড়বে। খাদ্যের দাম বাড়লে শহরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষও চাপের মুখে পড়বে।

একই সঙ্গে খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলো নিজেদের বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে রপ্তানি সীমিত করলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

তখন তৈরি হতে পারে একটি জটিল চক্র—

যুদ্ধ → জ্বালানি সংকট → সার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি → সার মূল্যবৃদ্ধি → কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি → সার ব্যবহার কমার ঝুঁকি → ফলন কমার আশঙ্কা → খাদ্যের দাম বৃদ্ধি → মূল্যস্ফীতি।

এই চক্র দীর্ঘস্থায়ী হলে খাদ্যনিরাপত্তা একটি বড় বৈশ্বিক রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হতে পারে।

২০২৭ কি দুর্ভিক্ষের বছর?

এখানে আতঙ্কের বদলে সতর্কতা জরুরি। বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৭ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ নিশ্চিত—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস নেই। বরং বিশ্বব্যাংকের বর্তমান পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সার সরবরাহ পুনরুদ্ধার এবং নতুন উৎপাদন সক্ষমতা বাজারে এলে সারমূল্য কমতে পারে।

তবে একই পূর্বাভাসে সতর্ক করা হয়েছে—হরমুজের দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা, জ্বালানি মূল্য উঁচু থাকা এবং নতুন করে রপ্তানি বিধিনিষেধ আরোপ হলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

অর্থাৎ ২০২৭ সালের জন্য সবচেয়ে যুক্তিসংগত শব্দ হলো ‘অনিশ্চয়তা’, ‘নিশ্চিত দুর্ভিক্ষ’ নয়।

বাংলাদেশের প্রস্তুতি কী হওয়া উচিত?

বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতিতে আতঙ্ক ছড়ানোর চেয়ে আগাম প্রস্তুতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, পর্যাপ্ত সার মজুত নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শুধু কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভর না করে সার আমদানির উৎস বহুমুখী করতে হবে। তৃতীয়ত, কৃষক পর্যায়ে সারের অপচয় কমিয়ে সঠিক মাত্রায় ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিকল্প সার উৎপাদন ও আমদানির সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কৃষক যেন দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রয়োজনীয় সার ব্যবহার কমিয়ে দিতে বাধ্য না হন। কারণ আজ কৃষকের সার ব্যবহারে যে ঘাটতি তৈরি হবে, তার প্রভাব কয়েক মাস পর খাদ্যের বাজারে দেখা দিতে পারে।

সামনে আসল যুদ্ধ খাদ্যের জন্য?

হরমুজ, লোহিত সাগর ও কৃষ্ণসাগর—বিশ্বের খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অঞ্চল। এসব অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে তার প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে কৃষকের জমিতে পৌঁছাবে।

তবে এখনো বিশ্ববাজার বিকল্প সরবরাহের মাধ্যমে ধাক্কা সামলানোর চেষ্টা করছে। তাই ‘বিশ্ব খাদ্য উৎপাদন তলানিতে নেমে যাবে’—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।

কিন্তু সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। কারণ খাদ্য উৎপাদন শুরু হয় যুদ্ধের ময়দানে নয়—কৃষকের জমিতে। আর সেই জমিতে বীজের পাশাপাশি যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তার একটি হলো সার।

যদি যুদ্ধের কারণে সার ব্যয়বহুল হয়ে যায়, সরবরাহ কমে যায় এবং কৃষক প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার কিনতে না পারেন, তাহলে যুদ্ধের একটি নতুন ফ্রন্ট তৈরি হতে পারে—খাদ্যের বাজারে।

সেই অর্থে আগামী দিনের বড় ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন শুধু ‘কে কাকে হারাবে’ নয়; বরং কোন দেশ তার কৃষক, সার ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা কতটা নিরাপদ রাখতে পারবে।