ইরানের শীর্ষ নেতারা কোথায় অবস্থান করছেন এবং তারা কী করছেন—ইসরায়েল তা জানে বলে দাবি করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন। ইরান ইসরায়েলের ওপর হামলা চালালে দেশটির নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করতে ইসরায়েলের খুব বেশি সময় লাগবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড্যানন বলেন, “আমরা জানি নেতারা কোথায় লুকিয়ে আছেন। আমরা জানি তারা কী করছেন। আমরা জানি তারা কী বলছেন।”
তিনি আরও বলেন, “তারা যদি ইসরায়েলের ওপর হামলা করে, তাহলে তাদের ধরতে আমাদের মাত্র কয়েক দিন সময় লাগবে।” ড্যাননের বক্তব্যের কোনো স্বাধীন যাচাই প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
ড্যাননের এই বক্তব্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও দেশটির নেতৃত্বের ওপর ইসরায়েলের গোয়েন্দা নজরদারির দাবির ধারাবাহিকতায় এসেছে।
এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বর ফক্স নিউজকে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে ড্যানন দাবি করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে ইসরায়েলের শক্তিশালী গোয়েন্দা সক্ষমতা রয়েছে। কোনো হুমকি শনাক্ত হলে ইরানের নেতৃত্ব ও পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার সক্ষমতাও ইসরায়েলের রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
তবে ড্যাননের এসব বক্তব্য মূলত ইসরায়েলি সরকারের একজন শীর্ষ কূটনীতিকের দাবি। তিনি যে গোয়েন্দা তথ্যের কথা বলেছেন, তার বিস্তারিত বা নির্দিষ্ট অবস্থানের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ড্যাননের মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও চলছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈঠকটিকে ‘খুব ভালো’ ও ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা না হলে আরও কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ফলে সামরিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও একই সময়ে চলতে দেখা যাচ্ছে।
ইরানের পক্ষ থেকেও আলোচনার বিষয়ে মিশ্র বার্তা এসেছে। তেহরান দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে এমন আলোচনায় আগ্রহের কথা জানিয়েছে। একই সময়ে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে প্রকাশ্যে উল্লেখ করা।
ড্যানন সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট নেতার নাম বলেননি। তিনি শুধু দাবি করেছেন, ইসরায়েল জানে ইরানের নেতারা কোথায় অবস্থান করছেন। একই সঙ্গে ইরান থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো হামলা হলে দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতার কথাও বলেছেন।
এর আগে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়ে উভয় পক্ষই একে অপরের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছে। তবে ড্যাননের সর্বশেষ বক্তব্যে গোয়েন্দা সক্ষমতার দাবি এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি একই সঙ্গে উঠে এসেছে।
ড্যাননের বক্তব্যের সময়কাল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে, অন্যদিকে ইসরায়েল ইরানের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে কঠোর বার্তা দিচ্ছে।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সামরিক হুমকি পাশাপাশি চলছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদের বৈঠক ভবিষ্যৎ আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি করলেও এখন পর্যন্ত কোনো বড় চুক্তি বা সংঘাতের স্থায়ী অবসানের ঘোষণা আসেনি।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি, ইরানের ওপর মার্কিন চাপ এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—এসব বিষয় আগামী আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে ইরানের নেতাদের অবস্থান সম্পর্কে ড্যাননের দাবির বাস্তবতা এবং ইসরায়েল ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট নেতাকে লক্ষ্য করবে কি না—এ বিষয়ে প্রকাশ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখনো সীমিত।
সব মিলিয়ে ড্যাননের বক্তব্য ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ানোর মতো একটি প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলায় আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহই দেখাবে এই হুমকির পর দুই পক্ষ আলোচনার পথে এগোয়, নাকি সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ে।