পাকিস্তানকে ‘সন্ত্রাসী দেশ' বললেন জয়শঙ্কর

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ভারত সরকার পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করবে কবে সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে জয়শঙ্কর বলেন, ‘একটি সন্ত্রাসী দেশ আমাকে এই প্রশ্ন করছে?’

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শুক্রবার এ ঘটনা ঘটে। জয়শঙ্কর ও লাইবেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সারা বেইসোলো ন্যান্টি তখন জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গঠিত ‘গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস’-সংক্রান্ত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তাঁদের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর পাকিস্তানি সাংবাদিক প্রশ্নটি করেন।

জয়শঙ্করের জবাবের পর জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি হরিশ পার্বতানেনি ওই সাংবাদিককে বলেন, ‘আপনি আপনার উত্তর শুনেছেন। আপনার প্রশ্নের জবাব স্পষ্টভাবেই পেয়েছেন।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান বিরোধের বিষয় হয়ে রয়েছে।

ভারত দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, পাকিস্তানভিত্তিক বা পাকিস্তানের ভূখণ্ডে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ভারতের বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত। পাকিস্তান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ভারত ওই হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দায়ী করে। পাকিস্তান হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিল।

পাহেলগাম হামলার পর ভারত পাকিস্তান ও পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। নয়টি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল বলে ভারত জানিয়েছিল। এসব স্থাপনার সঙ্গে লস্কর-ই-তাইয়েবা (এলইটি) ও জইশ-ই-মোহাম্মদের (জেইএম) মতো গোষ্ঠীর যোগাযোগের অভিযোগও ভারত তুলে ধরে।

জয়শঙ্করের মন্তব্যের এক দিন আগে জাতিসংঘের আরেক ফোরামেও পাকিস্তানকে নিয়ে কড়া বক্তব্য দেন ভারতের কূটনীতিক ক্ষিতিজ ত্যাগী।

তিনি বলেন, পাকিস্তানের উচিত অন্য দেশের ভূখণ্ডের দাবি বা সন্ত্রাসবাদে সহায়তার অভিযোগের পরিবর্তে নিজেদের অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়া।

ত্যাগী পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও হতাহতের বিষয়ও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে বিক্ষোভের সময় বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছিল।

ভারতীয় কূটনীতিক আরও অভিযোগ করেন, এসব বিষয়ে জাতিসংঘে পাকিস্তানের জবাব ছিল মূলত ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’-এর মাধ্যমে আপত্তি তোলা।

তবে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পরিস্থিতি এবং বিক্ষোভে হতাহতের বিষয়ে ভারতীয় পক্ষের অভিযোগগুলোকে পাকিস্তানের নিজস্ব বক্তব্য ও ব্যাখ্যার সঙ্গে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জয়শঙ্কর-পাকিস্তানি সাংবাদিকের এই বাকযুদ্ধের এক দিন আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকেও জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রবেশের সময় একই ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল।

এক ভারতীয় সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেন, পাকিস্তান কবে ‘সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া’ বন্ধ করবে। শরিফ ওই প্রশ্নের জবাব দেননি বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এর পরদিন পাকিস্তানি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জয়শঙ্করের মন্তব্য দুই দেশের চলমান কূটনৈতিক উত্তেজনার আরেকটি প্রকাশ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

এবারের ঘটনা সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক ভারত-পাকিস্তান বৈঠকে ঘটেনি। জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে একটি সংবাদ ব্রিফিংয়ের শেষ পর্যায়ে সাংবাদিকের প্রশ্ন থেকে বিতর্কের সূত্রপাত হয়।

ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ও সীমান্তপারের সহিংসতায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করে আসছে। ফলে জাতিসংঘের মতো বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক মঞ্চেও দুই দেশের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে এ বিরোধ প্রায়ই উঠে আসে।

জয়শঙ্করের সর্বশেষ মন্তব্যও সেই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের প্রেক্ষাপটেই এসেছে। তাঁর বক্তব্য ভারতের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে; একই সঙ্গে পাকিস্তান ভারতীয় অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ফলে ঘটনাটি দুই দেশের পারস্পরিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।