চীনের ‘এক চীন নীতি’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের আকাশসীমায় তাইওয়ানের বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনায় নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত মাসে তাইওয়ানের দুটি বিমান সংস্থাকে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করতে বাধা দেওয়ার পর বেইজিংয়ের প্রভাব এবং ইসলামাবাদের নীতিগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছিল তাইওয়ানের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা চায়না এয়ারলাইনস এবং বেসরকারি সংস্থা ইভিএ এয়ার। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এ বিষয়ে বলেন, ‘বেসামরিক বিমান চলাচল বিভাগ এক চীন নীতি অনুসরণ করে। কেবল মূল ভূখণ্ডের চীনকেই অনুমতি দেওয়া হয়।’ তবে পরবর্তী সময়ে আকস্মিকভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় পাকিস্তান। দুই বিমান সংস্থাকেই ২০২৭ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত দেশটির আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এটি সাময়িক ব্যবস্থা এবং নির্ধারিত সময়ের পর কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সে বিষয়ে ইসলামাবাদ কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত এবং তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের অবস্থানকে সমর্থন করে আসছে। ইসলামাবাদ তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এবং তাইপের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখে না। তাইওয়ানে ৯০০ জনের কিছু বেশি পাকিস্তানি নাগরিক বসবাস করেন। তাদের মধ্যে শিক্ষার্থী, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন। দুই পক্ষের মধ্যে কোনো প্রতিনিধি কার্যালয় নেই এবং সরাসরি বিমান যোগাযোগও চালু নেই। দক্ষিণ এশিয়া থেকে তাইওয়ানের একমাত্র বিমান সংযোগ তাইপে-দিল্লি রুট, যা আগামী ১ ডিসেম্বর পুনরায় চালুর কথা রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ‘এক চীন নীতি’ অনুসরণ করার অর্থ সাধারণত তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা, বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বের দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না রাখা। কিন্তু এর অর্থ তাইওয়ানের বাণিজ্যিক বিমান সংস্থাগুলোকে অন্য দেশের আকাশসীমা ব্যবহারে বাধা দেওয়া নয়। এমনকি চীন নিজেও তাইওয়ানের বাণিজ্যিক বিমান সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে না।
নিষেধাজ্ঞার পেছনে চীনের ভূমিকা কতটা?
পাকিস্তানের এ সিদ্ধান্তের পেছনে দুটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকরা। প্রথমত, চীন নিজেই পাকিস্তানকে নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধ করে থাকতে পারে। এর মাধ্যমে বেইজিং আন্তর্জাতিক পরিসরে তাইওয়ানের সম্পৃক্ততা নিরুৎসাহিত করা এবং মিত্র দেশগুলোর ওপর নিজেদের প্রভাব প্রদর্শন করতে চেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, চীনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য পাকিস্তান নিজ উদ্যোগেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার প্রচেষ্টার মধ্যেও বেইজিংকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছে ইসলামাবাদ।
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) নিয়েও বর্তমানে নিরাপত্তা ও কৌশলগত নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্প চীনের জন্য প্রত্যাশিত কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে তাইওয়ানের বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপকে চীনের প্রতি পাকিস্তানের আনুগত্য প্রদর্শনের একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
বিমান চলাচলে কী প্রভাব পড়তে পারে?
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপগামী তাইওয়ানের বিমানগুলোর জন্য পাকিস্তানের আকাশসীমা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৭ সালের মার্চের পর আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে বিমান সংস্থাগুলোকে বিকল্প পথে চলাচল করতে হতে পারে। এতে ফ্লাইটের সময় ও পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে। যদিও দীর্ঘমেয়াদে তাইওয়ানের জন্য এর প্রভাব সীমিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, এ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্য নজির হয়ে উঠতে পারে। চীন তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ও ‘এক চীন নীতি’ অনুসরণকারী দেশগুলোর ওপর একই ধরনের চাপ প্রয়োগ করে তাইওয়ানের বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইসিএও)-তে তাইওয়ানের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা দেশটির জন্য আরও জটিল হতে পারে।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের এ সিদ্ধান্ত চীনের প্রতি ইসলামাবাদের রাজনৈতিক আনুগত্য এবং তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের প্রভাবের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। তবে বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে ‘এক চীন নীতি’র প্রয়োগ পাকিস্তানের জন্য বাস্তব কোনো সুবিধা বয়ে আনবে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রিয়াদের আরামকো টাওয়ারে হুথিদের মিসাইল হামলা
ইয়েমেনে সেনা পাঠাচ্ছে না সিরিয়া
রুশ ডিজেল কিনতে অনাগ্রহী মার্কিন ব্যবসায়ীরা, সাগরে ঘুরছে ট্যাংকার
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দৃশ্য টিভিতে দেখে কেঁদেছিলাম: সোনিয়া গান্ধী