এরদোয়ানের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে নেতানিয়াহু

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় টিম এবং দেশটির বিচার মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে আইনি নথি প্রস্তুতের নির্দেশ দিয়েছেন বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম i24NEWS-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরদোয়ান নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানোর পরই ইসরায়েলের পাল্টা আইনি প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে আসে। এর আগে ২১ আগস্ট তুরস্ক জানিয়েছিল, গাজামুখী মানবিক সহায়তা বহরে ইসরায়েলি অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মামলায় নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ চাওয়া হবে।

তবে এবার ইসরায়েলের সম্ভাব্য মামলার লক্ষ্য নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তুরস্কের নেওয়া পদক্ষেপের সরাসরি আইনি জবাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। i24NEWS-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য মামলায় তুরস্কে কুর্দিদের সঙ্গে এরদোয়ান সরকারের আচরণ এবং হামাসের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক ও কথিত অর্থায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।

ইসরায়েল চাইলে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসিতে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইসরায়েল নিজে সরাসরি আদালতে যাবে, নাকি কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি উত্থাপন করবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।

i24NEWS জানিয়েছে, ইসরায়েল ও তুরস্ক—দুই দেশই রোম সংবিধির পক্ষভুক্ত নয়। ফলে আইসিসির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং কোনো সম্ভাব্য মামলার আইনি ভিত্তি জটিল হতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলের একটি অংশ মনে করছে, শেষ পর্যন্ত মামলাটি আদালতে নেওয়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে। সম্ভাব্য মামলাটিকেই এরদোয়ানের ওপর চাপ প্রয়োগ ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ঠেকানোর একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।

অর্থাৎ, এটি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক মামলা নয়; বরং সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি হিসেবে বিষয়টি সামনে এসেছে।

নেতানিয়াহু ও এরদোয়ানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। গাজা যুদ্ধের পর সেই বিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়েছে।

গত শুক্রবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু এরদোয়ানকে ‘স্বৈরশাসক’ বলে আক্রমণ করেন। একই সঙ্গে তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্যের অভিযোগ তোলেন।

এরপর তুরস্কের পক্ষ থেকেও নেতানিয়াহুর বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করা হয়। তুরস্কের যোগাযোগবিষয়ক কর্মকর্তারা তার বক্তব্যকে ইসরায়েলের গাজা ও অন্যান্য অঞ্চলের সামরিক কর্মকাণ্ড থেকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেন।

ফলে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বাকযুদ্ধ এবার আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনার দিকেও এগোচ্ছে।

এরদোয়ানের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ তুলতে চায় ইসরায়েল?

i24NEWS-এর প্রতিবেদনে সম্ভাব্য মামলার দুটি প্রধান বিষয় উঠে এসেছে।

একটি হলো তুরস্কে কুর্দিদের সঙ্গে এরদোয়ান সরকারের আচরণ। অন্যটি হলো হামাসের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক এবং কথিত অর্থায়ন।

তবে এগুলো ইসরায়েলের সম্ভাব্য আইনি মামলার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত অভিযোগ—আদালতে প্রমাণিত কোনো অপরাধ হিসেবে এগুলোকে দেখার সুযোগ নেই।

বিশেষ করে কুর্দি ইস্যুটি তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। একই সময়ে আঙ্কারা কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকে-কে ঘিরে একটি নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে এরদোয়ান সরকারের কুর্দি নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনি প্রশ্ন তোলার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ।

এর আগে তুরস্ক নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ চাওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গাজামুখী একটি মানবিক সহায়তা বহরে ইসরায়েলি অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি তুর্কি মামলায় নেতানিয়াহুকে আসামি করা হয়েছে।

তুরস্কের এই পদক্ষেপের পর থেকেই ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এখন নেতানিয়াহুর নির্দেশে এরদোয়ানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি নথি তৈরির খবর সেই পাল্টাপাল্টি চাপেরই নতুন ধাপ হিসেবে সামনে এসেছে।

তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নিজে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। দেশটির বিচার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও i24NEWS-এর কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের সম্ভাব্য পদক্ষেপের উদ্দেশ্য শুধু আদালতে মামলা করা নয়। সম্ভাব্য মামলার অস্তিত্বকেই এরদোয়ানের ওপর চাপ প্রয়োগের উপায় হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা থাকতে পারে।

অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত মামলা করা না হলেও এর প্রস্তুতি তুরস্ককে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে চাপে রাখার একটি হাতিয়ার হতে পারে।

এদিকে তুরস্কও ইতোমধ্যে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের পথে এগিয়েছে। ফলে দুই দেশের রাজনৈতিক সংঘাত যদি আইনি মঞ্চে গড়ায়, তাহলে এর প্রভাব শুধু ইসরায়েল-তুরস্ক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারব্যবস্থা, আইসিসির এখতিয়ার এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

ইসরায়েল ও তুরস্কের সম্পর্কের এই নতুন টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গাজা যুদ্ধ।

তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে আসছে। অন্যদিকে ইসরায়েল তুরস্কের হামাস-সম্পর্কিত অবস্থান এবং নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে আঙ্কারার আইনি পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে।

ফলে সামরিক সংঘাতের বাইরে এবার দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনি চাপের লড়াই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

তবে নেতানিয়াহুর নির্দেশের খবরটি এখন পর্যন্ত একটি ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনভিত্তিক। সম্ভাব্য মামলা আদৌ দায়ের হবে কি না, হলে কোন আদালতে হবে এবং তার আইনি ভিত্তি কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এরদোয়ানের বিরুদ্ধে আইনি নথি তৈরির প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়ে তুরস্কের সঙ্গে চলমান বিরোধকে নেতানিয়াহু সরকার নতুন একটি আইনি মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।