মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের সামনে নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ

দুই দশকের বেশি সময় ধরে ইরাকে থাকা মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী দেশটির অবশিষ্ট মার্কিন সেনারাও প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এই প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে ইরাক একদিকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতীকী বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে মার্কিন বাহিনীর অনুপস্থিতিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার নতুন সমীকরণ সামলানোর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের ইরাক মিশনের অবসান উপলক্ষে দেশটিতে চার দিন ‘সার্বভৌমত্ব দিবস’ পালনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক উপস্থিতির দীর্ঘ অধ্যায়ের প্রতীকী সমাপ্তি হিসেবে এ আয়োজনকে দেখা হচ্ছে। ইরাকে মার্কিন সেনা একবার পুরোপুরি প্রত্যাহার করেছিল ২০১১ সালে। কিন্তু ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট বা আইএস ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করার পর বাগদাদের অনুরোধে মার্কিন বাহিনী আবার ফিরে আসে। পরবর্তী সময়ে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ওয়াশিংটন ও বাগদাদ ২০২৪ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক মিশন ধীরে ধীরে শেষ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদি ৩০ সেপ্টেম্বরের সময়সীমাকে ‘চূড়ান্ত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার কার্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে ইরাক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করবে এবং দেশটিতে কোনো বিদেশি সামরিক উপস্থিতি থাকবে না। প্রত্যাহারের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকের সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না। বরং দুই দেশের সম্পর্ক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে মার্কিন সেনা, গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও বিমান সক্ষমতার সরাসরি উপস্থিতি না থাকায় ইরাকের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে।

মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরাকের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- দেশটির বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে কতটা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী আল-জায়েদির সরকার দেশের সব অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। আগে ৩০ সেপ্টেম্বরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হিসেবে ধরা হলেও এখন ইরান-ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্রীকরণ বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে আনার প্রক্রিয়া ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত চলতে পারে।

ইরাকের বহু শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস বা পিএমএফের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। আনুষ্ঠানিকভাবে পিএমএফ ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হলেও এর কয়েকটি গোষ্ঠী নিজস্ব কমান্ড কাঠামো ধরে রেখেছে এবং ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কিছু গোষ্ঠী বাগদাদের সঙ্গে অস্ত্র হস্তান্তর বা রাষ্ট্রীয় বাহিনীতে একীভূত হওয়ার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সব গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বাস্তবে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এখনো হয়নি।

ইরাকের জন্য সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখা। ইরাকের প্রতিবেশী ইরান দেশটির রাজনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে এবং আইএসবিরোধী অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের সরকারকে একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং তেহরানের সঙ্গে প্রতিবেশী ও কৌশলগত সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ নিয়েও বাগদাদকে এই ভারসাম্য রক্ষার বাস্তব পরীক্ষা দিতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান-ইরাক বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ার পর ইরাকি এয়ারওয়েজকে সীমিত ফ্লাইট পরিচালনার জন্য এক মাসের বিশেষ ছাড় দিয়েছে ওয়াশিংটন।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো- ইসলামিক স্টেটের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক। আইএস ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বহু বছর আগে বিতাড়িত হলেও সংগঠনটির ‘স্লিপার সেল’ এখনো সক্রিয় থাকার কথা বিভিন্ন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন। মার্কিন বাহিনী এতদিন ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য, আকাশপথে নজরদারি এবং আইএসের গতিবিধি শনাক্তে সহায়তা করেছে। এই সক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হলে ইরাকের নিজস্ব বাহিনীকে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।

ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, নিরাপত্তা কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী না হলে আইএস নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তবে আইএসের আগের মতো ভূখণ্ড দখল করে ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা রয়েছে এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ বর্তমানে নেই। মূল উদ্বেগ হলো বিচ্ছিন্ন হামলা, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক এবং নিরাপত্তা দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া।

ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নির্ভর করছে না। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সামরিক উত্তেজনার প্রভাবও দেশটির ওপর পড়ছে। ইরান-ঘনিষ্ঠ কিছু ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠী অতীতে মার্কিন ঘাঁটি ও আঞ্চলিক স্বার্থে হামলা চালিয়েছে। ফলে মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর এসব গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের ওপর বাগদাদ কতটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি সতর্ক করেছেন, ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে দেশটি আরও বড় রাজনৈতিক বিভাজনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে এটি রুবিওর রাজনৈতিক মূল্যায়ন; ইরাকের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়। মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ইরাকের জন্য একদিকে দীর্ঘ বিদেশি সামরিক উপস্থিতির অবসান, অন্যদিকে নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা প্রমাণের নতুন পরীক্ষা।

বাগদাদের সামনে এখন অন্তত তিনটি বড় কাজ- রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, আইএসের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক মোকাবিলা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা। এর সঙ্গে রয়েছে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও আঞ্চলিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার প্রয়োজন। ফলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে শুধু একটি সামরিক ঘটনার সমাপ্তি হিসেবে দেখলে ইরাকের সামনে থাকা বৃহত্তর চ্যালেঞ্জগুলো আড়ালে পড়ে যাবে।

৩০ সেপ্টেম্বরের পর ইরাকের নিরাপত্তা কাঠামো কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার প্রক্রিয়া কতদূর এগোয় এবং আইএসের মতো সংগঠনগুলো সেই পরিবর্তনের সুযোগ নিতে পারে কি না এসব প্রশ্নই এখন বাগদাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।