কাতারের প্রধানমন্ত্রী

গাজার যুদ্ধাপরাধ থেকে দৃষ্টি সরাতেই কাতারকে টার্গেট করছেন নেতানিয়াহু

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৯ এএম

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কাতারকে আক্রমণ করে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি।

ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কাতারের সমালোচনার জবাবে নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে কাতারকে আক্রমণ করছেন এবং এর মাধ্যমে জনমতকে অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ফলে কী ঘটছে, সেটি।

সাক্ষাৎকারে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেন শেখ মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ছিল ‘গণহত্যার মতো ঘটনা’ এবং এর জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। তবে এর পর ইসরায়েলের সামরিক প্রতিক্রিয়াকে তিনি ন্যায্যতা দেওয়ার মতো কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন।

কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, গাজায় হাসপাতাল ও স্কুলে হামলা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের পক্ষে যে যুক্তিই দেওয়া হোক না কেন, সেগুলো গ্রহণযোগ্য নয় বলে তাঁর মন্তব্য। তিনি আরও বলেন, গাজার পরিস্থিতির জন্য যারা দায়ী, তাদের জবাবদিহি করতে হবে।

সাক্ষাৎকারে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দোহায় ইসরায়েলের হামলার বিষয়টিও তুলে ধরেন। ওই হামলায় হামাসের কয়েকজন সদস্য এবং কাতারের একজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন বলে কাতারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। হামলার সময় দোহা যুদ্ধবিরতি ও মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় যুক্ত ছিল।

শেখ মোহাম্মদ বলেন, কাতার যখন মধ্যস্থতা করছিল, তখন দেশটির ভূখণ্ডে হামলা চালানো ‘অগ্রহণযোগ্য’। তাঁর ভাষায়, কোনো মধ্যস্থতাকারীকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর ঘটনা একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করে। তিনি বলেন, নেতানিয়াহু এ ঘটনায় ‘সীমা অতিক্রম করেছেন’।

আঞ্চলিক উত্তেজনা সত্ত্বেও কাতার মধ্যস্থতার ভূমিকা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন শেখ মোহাম্মদ। তাঁর মতে, বন্ধ দরজার আড়ালে কূটনৈতিক আলোচনা এখনো সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর পথগুলোর একটি।

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমাধান খুঁজতে কাতার উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরামর্শের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারিও জানিয়েছেন, দোহা বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে ভূমিকা রাখছে।

সাক্ষাৎকারে কাতারের প্রধানমন্ত্রী গাজা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিয়ে কথা বলেন। তাঁর মতে, যুদ্ধের অবসানের জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে একটি সমঝোতা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইরানকে নিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

শেখ মোহাম্মদের মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো কার্যকর করতে হলে ইরান ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি সংলাপ, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক আগ্রাসন এড়িয়ে চলার নীতিতে ঐকমত্য প্রয়োজন।

পিয়ার্স মরগানের সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলের সঙ্গে বিরোধের পাশাপাশি হামাসের সঙ্গে দোহার সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন। কাতার দীর্ঘদিন ধরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে।

পডকাস্টের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, সাক্ষাৎকারে কাতারের বিরুদ্ধে অর্থায়ন ও প্রভাব বিস্তারের বিভিন্ন অভিযোগও আলোচিত হয়। শেখ মোহাম্মদ এসব অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং কাতারের মানবিক সহায়তা ও অর্থায়ন আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে বলে জানান।

সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে কাতারের প্রধানমন্ত্রী একদিকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতসহ বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংকটে কূটনৈতিক মধ্যস্থতার ভূমিকা অব্যাহত রাখার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন