ইরানের উপর ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পরোক্ষ আলোচনায় এখনো বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। কাতারের মধ্যস্থতায় নিউইয়র্কে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও দুই পক্ষের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ব্যবধান রয়ে গেছে। এর মধ্যেই ইরানের অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে নতুন করে ১৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে নিউইয়র্কে বৈঠক করেন। আলোচনায় প্রধানত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরানের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। আরাগচি জানিয়েছেন, কাতারি মধ্যস্থতাকারীরা ওয়াশিংটনের কাছে আলোচনার বিষয়গুলো তুলে ধরবেন এবং তেহরান মার্কিন আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।

ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ছাড়ার পর হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা যেতে পারে। তেহরানের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, এসব পদক্ষেপ কয়েক দিনের মধ্যে বাস্তবায়িত হলে সপ্তম দিনের মধ্যে হরমুজ খুলে দিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা শুরু করা সম্ভব।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ইরানের এই প্রস্তাবকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো- শুধু হরমুজ প্রণালি বা যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলাদা সমঝোতা নয়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো একই আলোচনার আওতায় আনতে হবে। এখানেই আলোচনার অন্যতম প্রধান অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তেহরান চায় আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সম্পদ ছাড় এবং নৌ অবরোধের অবসানের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হোক; এরপর পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা এগোক। অন্যদিকে ওয়াশিংটন পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অগ্রগতি ছাড়া বড় ধরনের সমঝোতায় যেতে চাইছে না।

এদিকে নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপে রাশিয়া, চীন, হংকং ও পাকিস্তানভিত্তিক কয়েকটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য অস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট উপাদান সংগ্রহে সহায়তা করেছে। নতুন পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচির অংশ। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতার জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহব্যবস্থা শনাক্ত ও বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা আলোচনাকে ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ বলে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, পারমাণবিক ইস্যুতে অগ্রগতি ছাড়া চূড়ান্ত সমঝোতার সম্ভাবনা নেই। ইরানও বলছে, তারা আলোচনার পথ খোলা রাখতে প্রস্তুত।

হরমুজ প্রণালির প্রশ্নটি এই আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। যুদ্ধের পর প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান উৎপাদকদের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও তা যুদ্ধ-পূর্ব মাত্রার নিচে রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং আলোচনায় অগ্রগতির অভাব ইরানের অর্থনীতিতেও চাপ বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির মুদ্রা ডলারের বিপরীতে নতুন রেকর্ড নিম্নমুখী হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ কূটনৈতিক অচলাবস্থা বলা যাচ্ছে না। কাতারসহ মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছেন। ট্রাম্পও আরও আলোচনার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। ফলে এখন মূল প্রশ্ন হলো- হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোন পক্ষ কতটা সমঝোতায় যেতে প্রস্তুত এবং আলোচনার ক্রম নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ কীভাবে মেটানো যায়।

এই অবস্থায় একদিকে নতুন অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক তৎপরতা দুই পথই একই সঙ্গে চলছে। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করছে, এই পরোক্ষ আলোচনাগুলো শেষ পর্যন্ত একটি কাঠামোবদ্ধ সমঝোতার দিকে এগোয় কি-না তার ওপর।