ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘ডন অব ইয়েমেন’ (Dawn of Yemen) সামরিক অভিযানটিতে অগ্রগতি অর্জন করছে বলে দাবি করেছে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার। অভিযানের অগ্রগতির পাশাপাশি নিরাপত্তা প্রস্তুতি আরও জোরদার এবং নিয়ন্ত্রণে আসা গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকার।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সাবা (Saba News Agency)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) এডেনে প্রধানমন্ত্রী শায়া আল-জিন্দানি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের সর্বশেষ পরিস্থিতি, নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসা এলাকাগুলোতে প্রশাসনিক কার্যক্রম জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা প্রস্তুতি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে যেসব এলাকা হুথিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে সরকারি কর্তৃত্বে ফিরছে, সেখানে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা
সামরিক অভিযানের পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে ইয়েমেন সরকার। প্রধানমন্ত্রী জিন্দানি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অভিযানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌযান চলাচল সুরক্ষার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বাব আল-মান্দেব। লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালের সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথের সংযোগ তৈরি হওয়ায় এই প্রণালির নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দীর্ঘদিন ধরেই হুথিদের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন চেয়ে আসছে। নতুন অভিযানের ক্ষেত্রেও একই কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে।
‘মাঠপর্যায়ে অগ্রগতি’র দাবি
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (PLC) চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমিও সামরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন। সাবা নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধান তাকে চলমান লড়াইয়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। এরপর আল-আলিমি সরকারি বাহিনী ও তাদের সঙ্গে থাকা জনপ্রতিরোধ যোদ্ধাদের ‘মাঠপর্যায়ের অগ্রগতির’ প্রশংসা করেন।
তবে এই অগ্রগতি ঠিক কতটা ভূখণ্ডে, কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এবং কী ধরনের সামরিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে সাবার প্রতিবেদনে তার বিস্তারিত পরিসংখ্যান বা স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য মানচিত্র দেওয়া হয়নি। আল-আলিমি হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকার বাসিন্দাদের সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে নিয়োগ কার্যক্রমে সাড়া না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে হুথি যোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর নির্দেশ
ইয়েমেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাহের আল-আকিলিও সরকারি বাহিনীর অগ্রগতির প্রশংসা করেছেন। তিনি অনুমোদিত সামরিক পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, সামরিক অভিযান এখন শুধু সম্মুখযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যেসব এলাকায় সরকারি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেসব এলাকায় নিরাপত্তা, প্রশাসন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার প্রস্তুতিও একই সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে।
যুদ্ধের নতুন পর্যায়?
ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও হুথিদের মধ্যে সংঘাত কয়েক বছর ধরে দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতাকে বিভক্ত করে রেখেছে। হুথিরা রাজধানী সানা ও দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং তাদের মিত্ররা দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান ধরে রেখেছে।
এই বাস্তবতায় ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান যদি সত্যিই সরকারি বাহিনীর উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ড পুনর্দখলের সক্ষমতা তৈরি করে থাকে, তাহলে তা ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সামরিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সরকারি বাহিনীর দাবির পূর্ণ চিত্র পেতে স্বাধীন সামরিক ও ভূ-স্থানিক তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে মোচা, ধুবাব এবং বাব আল-মান্দেবের আশপাশের এলাকা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন হলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
হুথিদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ
সরকারি বাহিনীর অগ্রগতির দাবি এমন সময়ে এসেছে, যখন ইয়েমেনের সংঘাতের সামরিক প্রেক্ষাপট শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগর দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততার কারণে ইয়েমেনের যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়ছে।
তবে সরকারি বাহিনীর দাবি হুথিদের স্বাধীন সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, তা যাচাই না করে সামরিক অগ্রগতিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে উভয় পক্ষের দেওয়া তথ্য সাধারণত নিজেদের সামরিক অবস্থান তুলে ধরার উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়।
সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে সরকারি বাহিনী কতটা ভূখণ্ড ধরে রাখতে পারে, সেখানে কার্যকর প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে কি-না এবং হুথিদের পাল্টা প্রতিরোধ মোকাবিলা করতে পারে কি-না তার ওপর। একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবে নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ এই সমুদ্রপথে অস্থিতিশীলতা বাড়লে শুধু ইয়েমেন নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এই মুহূর্তে ইয়েমেন সরকারের বক্তব্য হলো- ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান অগ্রসর হচ্ছে এবং সরকারি বাহিনী মাঠে অগ্রগতি অর্জন করছে। তবে অভিযানের প্রকৃত সামরিক সাফল্যের মাত্রা নির্ধারণে আরও স্বাধীন তথ্য ও যুদ্ধক্ষেত্রের যাচাইযোগ্য পরিস্থিতি প্রয়োজন।