ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন—আনসারুল্লাহ নামেও পরিচিত—সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় সাম্প্রতিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সিরিয়া। দামেস্ক বলেছে, বেসামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি হুমকি এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে জানিয়েছে, দেশটির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় রিয়াদ যে বৈধ পদক্ষেপ নেবে, দামেস্ক তার পাশে থাকবে।
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, বেসামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা আন্তর্জাতিক আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের পরিপন্থী। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু সৌদি আরব নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি তৈরি করছে।
সৌদির বিমানবন্দরে প্রাণহানি
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৬ ও ৭ অক্টোবর আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা হয়। এসব হামলায় তিনজন নিহত এবং ৩৬ জন আহত হয়েছেন।
আবহা বিমানবন্দরে নিহত দুই নারী মরক্কো ও আলজেরিয়ার নাগরিক ছিলেন। ওই হামলায় ২৮ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে সৌদি নাগরিকের পাশাপাশি বাংলাদেশি ও ফিলিপাইনের নাগরিকও ছিলেন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিহত হন সুদানের এক নাগরিক; সেখানে আরও আটজন আহত হন।
হুথিরা এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যেই এই হামলার ঘটনা ঘটল।
সৌদি-সিরিয়া সম্পর্কের নতুন মাত্রা
সিরিয়ার এই প্রকাশ্য সমর্থনের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা সম্প্রতি রিয়াদ সফর করে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
সিরিয়ার সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে পুনর্গঠন, জ্বালানি, কৃষি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এর মধ্যেই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় দামেস্কের সরাসরি সংহতি প্রকাশ দুই দেশের ঘনিষ্ঠতার রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইয়েমেন সংঘাতে নতুন উত্তেজনা
সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী এবং ইরান-সমর্থিত হুথিদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত আরও বেড়েছে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের আশপাশে সামরিক তৎপরতা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী বাব আল-মান্দাব ও মোখা অঞ্চলে হুথিদের কাছ থেকে ভূখণ্ড পুনর্দখলের অভিযান চালিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে হুথিরাও সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে।
বাব আল-মান্দাব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর একটি। ফলে ইয়েমেনের সামরিক সংঘাত কেবল স্থানীয় যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।
সিরিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা
সৌদি আরবের সঙ্গে সিরিয়ার ঘনিষ্ঠতা বাড়ার সময়েই রিয়াদের বিরুদ্ধে হুথিদের হামলা দামেস্ককে একটি জটিল আঞ্চলিক অবস্থানের সামনে দাঁড় করিয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবকে সম্ভাব্য সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সিরিয়া বিবেচনা করছে। তবে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন, সামরিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর দেশের স্থিতিশীলতা—এসব বিষয়ও দামেস্কের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এ মুহূর্তে সিরিয়ার পক্ষ থেকে সৌদি আরবকে সামরিকভাবে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি। তবে কূটনৈতিকভাবে সৌদির পাশে থাকার ঘোষণা দুই দেশের সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা তুলে ধরছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বাড়ছে চাপ
সৌদি বিমানবন্দরে হামলা, ইয়েমেনে পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান এবং বাব আল-মান্দাব ঘিরে উত্তেজনা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে বেসামরিক বিমানবন্দর ও অবকাঠামো হামলার আওতায় আসায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং আকাশপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক হামলায় হতাহতের পাশাপাশি বিমানবন্দরগুলোর অবকাঠামোরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এ অবস্থায় সিরিয়ার প্রকাশ্য সমর্থন সৌদি আরবের সঙ্গে দামেস্কের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করার পাশাপাশি ইয়েমেন সংঘাতের আঞ্চলিক মাত্রাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। তবে সিরিয়া বাস্তবে সামরিকভাবে কতটা সম্পৃক্ত হবে, সেটি এখনো অনিশ্চিত।