ব্যয়বহুল সামরিক শক্তি নিয়েও হুথিদের ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে সৌদি আরব, কিন্তু কেন?

প্রতিরক্ষা খাতে বছরে প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে সৌদি আরব। অত্যাধুনিক এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ইউরোফাইটার টাইফুন, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ আধুনিক সামরিক সরঞ্জামে সমৃদ্ধ দেশটির সামরিক সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবু ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে দেশটিকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ধারাবাহিক হামলার দায় হুথিরা স্বীকার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিশেষ করে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হামলায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিভিন্ন দাবি থাকলেও সেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই হামলাগুলো ঘটছে। হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরব ইয়েমেনে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে এবং সরকারপন্থী বাহিনীর পাল্টা অভিযানে সমর্থন দিচ্ছে। এর জবাবে হুথিরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি সৌদি আরবের সামরিক শক্তির পাশাপাশি দেশটির প্রতিরক্ষা কৌশল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্যও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিপুল সামরিক ব্যয়, আমদানিনির্ভর অস্ত্রভান্ডার

২০২৫ সালে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যার পরিমাণ আনুমানিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। এই ব্যয়ের ভিত্তিতে দেশটি বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে।

সৌদি আরবের সামরিক বাহিনীতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো দেশের নির্মাতাদের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও বাড়িয়েছে রিয়াদ।

তবে আধুনিক অস্ত্রের বিশাল মজুত থাকলেই প্রতিটি হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবের সীমিত সামরিক শিল্পভিত্তি এবং বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে বিপুল পরিমাণ প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে সরবরাহ ও মজুতের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সক্ষমতা

২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর থেকে হুথিদের অস্ত্রভান্ডার ও সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। গোষ্ঠীটি এমন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে, যেগুলোর পাল্লা ইয়েমেনের বাইরেও দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর দাবি করা হয়েছে।

হুথিদের অস্ত্রভান্ডারে প্যালেস্টাইন-২ ও তুফান নামের ক্ষেপণাস্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়। প্যালেস্টাইন-২-কে দুই ধাপের কঠিন জ্বালানিচালিত মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তুফান ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ইরানের ঘদর ক্ষেপণাস্ত্রের একটি সংস্করণ বলে ধারণা করা হয়। এ ছাড়া বুরকান ও বদর সিরিজের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও তাদের হাতে রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

হুথিদের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিভিন্ন গতির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা। এতে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে একই সময়ে একাধিক ধরনের হুমকি শনাক্ত ও প্রতিহত করতে হয়। ফলে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো হামলা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

কেন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা দুর্বলতা সামনে আসছে?

কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস জুনো বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হুথিদের অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে পারলেও দেশটির বিশাল আয়তনের কারণে সর্বত্র ধারাবাহিকভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

প্রায় ২২ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সৌদি আরবকে একই সঙ্গে রাজধানী, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি, পবিত্র নগরী এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখতে হয়।

লন্ডনভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান মেনা অ্যানালিটিকার আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান এবং বিভিন্ন সেন্সর একত্রে ব্যবহার করলেও এত বড় ভূখণ্ডের ওপর সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র প্রতিরক্ষাবলয় তৈরি করা সম্ভব নয়।

রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও আয়তনে বিশাল। প্রায় ২২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বিমানবন্দরটি শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ফলে বিমানবন্দরটির প্রতিটি অংশ এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা বড় ধরনের নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ।

এ ছাড়া বারবার হামলার কারণে আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিশ্বজুড়েই এসব অস্ত্রের সরবরাহ নিয়ে চাপের খবর রয়েছে। তবে সৌদি আরবের বর্তমান মজুত বা ঘাটতির নির্ভরযোগ্য পরিমাণ প্রকাশিত না হলে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

কেন হামলা বাড়াচ্ছে হুথিরা?

বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিটি হামলায় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানাই হুথিদের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে মাঝেমধ্যে একটি হামলা সফল হলেও তা নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জনমনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

থমাস জুনোর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমান হামলার জবাবে হুথিরা একই ধরনের চাপ সৌদি ভূখণ্ডে তৈরি করতে চাইছে। সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের হুথিনিয়ন্ত্রিত সানা বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করার পর গোষ্ঠীটি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পাল্টা আঘাতের মাধ্যমে সংঘাতের হিসাব বদলাতে চাইছে বলে তাঁর বিশ্লেষণ।

হুথি আন্দোলন, যারা নিজেদের আনসারুল্লাহ নামেও পরিচয় দেয়, ইয়েমেনের দুর্গম ও পাহাড়ি ভূখণ্ডে দীর্ঘদিনের যুদ্ধে অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের ওপর নির্ভর করে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হুমকি সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর জন্যও উদ্বেগের বিষয়।

জুনোর মতে, গুরুত্বপূর্ণ সৌদি অবকাঠামোয় হামলার মাধ্যমে হুথিরা বোঝাতে চাইছে, ইয়েমেনের যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধান যত পিছিয়ে যাবে, সৌদি আরবের জন্য সংঘাতের মূল্য তত বাড়তে পারে।

এটি রিয়াদের জন্য বিশেষভাবে বিব্রতকর, কারণ সৌদি আরব কয়েক বছর ধরে ইয়েমেনের যুদ্ধ থেকে নিজেদের সম্পৃক্ততা কমানোর চেষ্টা করে আসছে।

ভিশন ২০৩০ ও অর্থনৈতিক ভাবমূর্তির ঝুঁকি

সৌদি আরবের জন্য বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা শুধু সামরিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি।

ক্রিগের মতে, রিয়াদের বিমানবন্দর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য পর্যটন, আন্তর্জাতিক ব্যবসা, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ এবং বড় ধরনের আন্তর্জাতিক আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে গড়ে তোলা।

বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বারবার হামলা হলে পর্যটক, বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এতে সরাসরি সামরিক ক্ষয়ক্ষতির বাইরেও অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক মূল্য দিতে হতে পারে দেশটিকে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদের বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলার খবর দেশটির গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজনের সময় সামনে এসেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি সৌদি আরবের নিরাপদ বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি ধরে রাখার প্রচেষ্টাকে কঠিন করে তুলতে পারে।

সামরিক শক্তির চেয়েও বড় পরীক্ষা

সৌদি আরবের হাতে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট রয়েছে। অন্যদিকে হুথিদের রয়েছে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা, দীর্ঘ সংঘাতের অভিজ্ঞতা এবং গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কৌশল।

এই অসম সামরিক বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য শুধু কতটি হামলা প্রতিহত করা হলো, তা দিয়ে মাপা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কতটা সুরক্ষিত থাকল, প্রতিরোধী অস্ত্রের সরবরাহ কতটা টেকসই হলো এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা কতটা বজায় রাখা গেল—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সৌদি আরবের সামনে তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ: একদিকে হুথিদের হামলা প্রতিহত করা, অন্যদিকে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। সামরিক শক্তি হামলার ক্ষতি কমাতে পারে, কিন্তু সংঘাতের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক সমাধানও প্রয়োজন।