ইউক্রেনের সামরিক ড্রোন পরিচালনায় স্পেসএক্সের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবায় বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ উঠেছে। এতে রাশিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো এবং রুশ ড্রোন প্রতিহত করার অভিযানে বিঘ্ন ঘটছে বলে দাবি করেছে কিয়েভ। একই সময়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিপর্যস্ত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, স্পেসএক্সের সামরিক ব্যবহারের উপযোগী স্টারলিংক টার্মিনালে আকস্মিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে দ্রুতগতিতে চলা সামরিক ড্রোনগুলোর সঙ্গে স্যাটেলাইট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তবে এ বিষয়ে স্পেসএক্সের বক্তব্য এবং বিধিনিষেধের প্রকৃত পরিধি সম্পর্কে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, এই সিদ্ধান্তের কারণে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। তবে এ পদক্ষেপের জন্য তিনি সরাসরি কাউকে দায়ী করেননি।
স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছেন, স্টারলিংকের গতিসীমা বা ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী নির্ধারণ করে এবং শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মাস্ক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ, আক্রমণ এবং আকাশ প্রতিরক্ষার কাজে বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ব্যবহার করে। এসব ড্রোনের অনেকগুলোতে স্টারলিংকের স্যাটেলাইট সংযোগের জন্য টার্মিনাল স্থাপন করা হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা সেরহি বেসক্রেস্টনভ টেলিগ্রামে লিখেছেন, বিধিনিষেধের বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। এতে কয়েকটি সামরিক অভিযান ব্যাহত হয়েছে বলে তার দাবি। ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলা ড্রোনের সংযোগে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। তবে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, কিছু সামরিক ইউনিট এর চেয়েও কম গতিতে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগ করেছে।
এ ধরনের সীমাবদ্ধতা ইউক্রেনের জন্য দুই দিক থেকেই সমস্যার কারণ হতে পারে। একদিকে, রুশ অবস্থান ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণকারী ড্রোনের কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। অন্যদিকে, রাশিয়ার ড্রোন প্রতিহত করতে ইউক্রেনের ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে স্পেসএক্স, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও ন্যাটোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে কিয়েভ।
ট্রাম্প-মাস্কের সিদ্ধান্তে ইউক্রেনের উদ্বেগ
স্টারলিংক নিয়ে বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প সম্প্রতি ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে রুশ ডিজেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পদক্ষেপও নিয়েছে ওয়াশিংটন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ‘পিয়ার্স মরগান আনসেন্সরড’ অনুষ্ঠানে বলেছেন, ট্রাম্প যখন কোনো একটি পক্ষ বেছে নেন, তখন তা ইউক্রেনের জন্য বেদনাদায়ক। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে চায়, তাহলে তাকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। ইউক্রেনের নেতৃত্ব পরিবর্তন নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেছেন জেলেনস্কি। তিনি বলেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট কে হবেন, তা দেশটির জনগণই নির্ধারণ করবে; অন্য কোনো দেশের নেতা বা ব্যক্তি নয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। তবে ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, ওয়াশিংটন এখনো গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করছে।
রুশ হামলায় বিদ্যুৎহীন ছয় লাখ মানুষ
স্টারলিংক নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ, খারকিভসহ বিভিন্ন এলাকায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় হামলার কারণে প্রায় ছয় লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, হামলায় ৩০টি জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কিয়েভের আশপাশে চারটি এবং খারকিভ অঞ্চলে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার কথা নিশ্চিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজধানী কিয়েভে একটি আবাসিক ভবনে হামলায় দুইজন নিহত এবং ২১ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পশ্চিমাঞ্চলীয় লুৎস্ক শহরে হামলায় আরও ছয়জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জেলেনস্কি এসব হামলাকে জ্বালানি স্থাপনায় আক্রমণ বন্ধ রাখার বিষয়ে ট্রাম্পের আহ্বানের প্রতি রাশিয়ার অবজ্ঞা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি কার্যকর হয়েছিল কি-না, সে বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য এক নয়।
ইউক্রেনের পাশে পোল্যান্ড, ক্ষুব্ধ ইউরোপ
ইউক্রেনের স্টারলিংক সংযোগের খরচ বহন করে পোল্যান্ড। বিধিনিষেধের অভিযোগ সামনে আসার পর পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মাস্কের সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মাস্ক তার ব্যবসায়িক পণ্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন কি-না। ইউরোপীয় গ্রাহক হিসেবে তারা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন বলেও জানান সিকোরস্কি। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে স্টারলিংকের গুরুত্ব শুধু যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্যাটেলাইট সংযোগ যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য আদান-প্রদান, ড্রোন পরিচালনা এবং বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এ সেবায় পরিবর্তন হলে সামরিক কার্যক্রমে তার প্রভাব পড়তে পারে।
যুদ্ধের মোড় বদলে দিতে পারে স্টারলিংক সংকট
ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, আধুনিক সংঘাতে স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা সীমিত হলে তার প্রভাব সামরিক অভিযানের ওপর পড়তে পারে, বিশেষ করে যখন সেই সেবা বিকল্প প্রযুক্তির তুলনায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
তবে স্টারলিংকের বিধিনিষেধ ইউক্রেনের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কতটা কমিয়ে দেবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। এর জন্য বিধিনিষেধের সুনির্দিষ্ট পরিধি, বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা এবং ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর অভিযোজনক্ষমতা সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি নিয়ে অনিশ্চয়তা কিয়েভের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। রাশিয়ার হামলা অব্যাহত থাকা এবং ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণের সক্ষমতা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে স্টারলিংক সংকট দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।