হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ফের ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হলেন লুলা

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে আবারও জয়ী হয়েছেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয় দফায় ঘুরে দাঁড়িয়ে এই জয় পেয়েছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে দেশটির রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়েছেন ৮০ বছর বয়সী এই নেতা।

রোববার (২৫ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ৯টার কিছু পর ব্রাজিলের সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্ট লুলাকে বিজয়ী ঘোষণা করে। তখন পর্যন্ত গণনা করা ভোটের ৫১ শতাংশের বেশি পেয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে ডানপন্থী ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ৪০ লাখের বেশি। নির্বাচনে লুলার পক্ষে ভোট দিয়েছেন ৬ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ।

বিজয় ঘোষণার পরপরই সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন লুলা। এ সময় তাঁর কণ্ঠ ছিল কিছুটা কর্কশ। বক্তব্যে তিনি স্বীকার করেন, আগামী দিনে আইনসভায় নিজের কর্মসূচি বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন তিনি।

লুলা বলেন, তিনি কংগ্রেস নির্বাচন করেন না; জনগণই তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছে। সেই প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করেই নিজের কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত অনুমোদনের চেষ্টা করবেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের গণতন্ত্র রক্ষায় ভোট দেওয়ার জন্য সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান।

এই জয়ের মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল নজির স্থাপন করেছেন লুলা। দেশটিতে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকেও দ্বিতীয় দফায় জয়ী হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম।

লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান এদিনের জয়কে গণতন্ত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি সমর্থকদের উচ্ছ্বাসের কথাও তুলে ধরেন।

তবে পরাজয় মেনে নিতে রাজি নন ফ্লাভিও বলসোনারো। ভোটগ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে আদালতে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ভোটের মাঝপথে নিয়ম পরিবর্তন করা হয়েছে। এ কারণে নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়া সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ফল বাতিলের আবেদন করার কথাও জানিয়েছেন এই ডানপন্থী নেতা।

ভোটগ্রহণ ঘিরে বিতর্ক

লুলার জয়ে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের নেতারা অভিনন্দন জানিয়েছেন। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম ব্রাজিলের জনগণের জয় হয়েছে উল্লেখ করে লুলাকে অভিনন্দন জানান। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও লুলার পুনর্নির্বাচনকে অসাধারণ ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, লুলা ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষ ও গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন এবং আগামী চার বছরও সেই ভূমিকা অব্যাহত রাখবেন।

তবে নির্বাচনের দিন ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কয়েকটি এলাকায় গণপরিবহন চলাচল বন্ধ বা সীমিত থাকার খবর প্রকাশিত হয়। লুলার সমর্থকদের অভিযোগ, শ্রমজীবী ভোটারদের উপস্থিতি কমাতে বলসোনারোর সমর্থকেরা বাস চলাচল সীমিত করেছিলেন।

অন্যদিকে, ভারী বৃষ্টির কারণে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় ভোটগ্রহণ ব্যাহত হয়। এসব এলাকায় বলসোনারোর সমর্থন তুলনামূলক বেশি বলে বিবেচনা করা হয়।

পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে লুলা ও বলসোনারো—দুই প্রার্থীর শিবিরই ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন করে। পরে আদালতের বিচারপতি ক্রিস্তিয়ানো জানিনের সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে ভোটগ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত করা হয়। তবে বলসোনারোর অভিযোগ, কিছু ভোটকেন্দ্র সময়মতো আবার চালু করা সম্ভব হয়নি। এতে অতিরিক্ত সময়ে তাঁর পক্ষে পড়তে পারত—এমন ভোট থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন।

প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকেও জয়

লুলার এই বিজয়ের ফলে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর দায়িত্ব অব্যাহত থাকছে। একই সঙ্গে দেশটিতে ডানপন্থীদের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনাও আপাতত নাকচ হলো।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেরু, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া ও ইকুয়েডরের মতো দেশগুলোতে ডানপন্থী রাজনীতিকদের উত্থান ঘটেছে। তাঁদের অনেকে ক্ষমতাসীনদের প্রতি অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনও পেয়েছেন তাঁদের কেউ কেউ।

পেশায় ধাতুশিল্পের শ্রমিকদের সাবেক ট্রেড ইউনিয়ন নেতা লুলা ১৯৮০-এর দশকে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। সে সময় ব্রাজিলে সামরিক শাসনের অবসান ঘনিয়ে আসছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সাতবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন লুলা। এরপর ২০২২ সালের নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় ফেরেন। এবার জয়ী হয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তিনি। আগামী ৫ জানুয়ারি ২০২৭ তাঁর নতুন মেয়াদের শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি গণতন্ত্রে ফেরার পর ব্রাজিলের সবচেয়ে বেশি বয়সে শপথ নেওয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাবেন।

এবারের নির্বাচনের প্রথম দফায় ৪ অক্টোবর লুলা পেয়েছিলেন প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোট। বিপরীতে ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছিলেন প্রায় ৪৭ শতাংশ। কোনো প্রার্থীই ৫০ শতাংশ ভোট না পাওয়ায় নির্বাচন গড়ায় দ্বিতীয় দফায়।

প্রথম দফার পর লুলা জীবনযাত্রার ব্যয় ও শ্রমজীবী মানুষের সমস্যাকে সামনে রেখে প্রচার জোরদার করেন। এ মাসে পাস হওয়া ব্রাজিলের কর্মসপ্তাহ সংক্ষিপ্ত করার সাংবিধানিক সংশোধনীর প্রতি সমর্থন জানান তিনি। পাশাপাশি সপ্তাহান্তে বিনা মূল্যে গণপরিবহন চালুর সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন।

লুলার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজিত হওয়ার পর অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রে ভূমিকার অভিযোগে জইর বলসোনারোকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

লুলার তৃতীয় মেয়াদে দারিদ্র্য হ্রাস ও বেকারত্ব কমার মতো অগ্রগতি দেখা গেলেও তাঁর বয়স, অপরাধ দমন এবং রাজনৈতিক বিভাজন মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ছাড়া পরিবারের ঋণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্রাজিলীয় মনে করছেন, তাঁদের আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেপ্টেম্বরে অনলাইন জুয়া ও ক্রীড়া বাজির অ্যাপ নিষিদ্ধ করেন লুলা।

নতুন মেয়াদে চ্যালেঞ্জের মুখে লুলা

নির্বাচনে জয় লুলার রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করলেও নতুন মেয়াদে তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জ কম নয়। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ডানপন্থী কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হবে তাঁকে। ফলে আইন প্রণয়ন ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া লুলার পুনর্নির্বাচনের পর বলসোনারোর সমর্থক এবং ট্রাম্প প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ফ্লাভিও বলসোনারো ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন, নির্বাচনের দিন যা ঘটেছে, তা স্বাভাবিক নয় এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ট্রাম্পের বড় ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রও ভোটের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিচারিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যেই বলসোনারো পরিবারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। গত বছর জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে চলা বিচারিক প্রক্রিয়া বন্ধের চাপ তৈরির অংশ হিসেবে ব্রাজিলের কিছু পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিচারকদের বিরুদ্ধেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েসও ছিলেন।

লুলা এসব পদক্ষেপকে ব্রাজিলের বিচারব্যবস্থা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখেছেন।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের সমালোচক হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য রো খান্না বলেছেন, সারা বিশ্বের মানুষ উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে এবং ব্রাজিলে লুলার জয় সেই প্রবণতারই প্রতিফলন। তিনি ট্রাম্পকে নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়া এবং ব্রাজিলের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে দুর্বল করার চেষ্টা না করার আহ্বান জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে লুলার ঐতিহাসিক জয় ব্রাজিলের রাজনীতিতে বামপন্থীদের অবস্থান ধরে রাখলেও নতুন মেয়াদে অর্থনৈতিক চাপ, অপরাধ দমন, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সামলানোই হবে তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: আল-জাজিরা