জাকানির লক্ষ্য কি আহমাদিনেজাদ হওয়া?

তেহরানে বিনা মূল্যে মেট্রো ও বাসসেবা চালুর পর এবার সাধারণ মানুষের খাদ্যপণ্যের বাজারেও হস্তক্ষেপ করতে চাইছেন মেয়র আলিরেজা জাকানি। ‘জিরো ইনফ্লেশন’ প্রকল্পের মাধ্যমে ১২টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ছয় মাস স্থিতিশীল রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তবে অর্থায়নের উৎস, বাজেট অনুমোদন, বাজারে সরবরাহ সংকট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। সমালোচকদের কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনের আগে জনপ্রিয়তা অর্জনের এই কৌশলে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের রাজনৈতিক ছায়া দেখা যাচ্ছে।

ইরানের রাজধানী তেহরানের মেয়র আলিরেজা জাকানি এবার নগরসেবা ছাড়িয়ে সরাসরি মানুষের খাবারের টেবিলে পৌঁছাতে চাইছেন। মেট্রো ও বাসে বিনা মূল্যে যাতায়াতের ব্যবস্থা চালুর পর এবার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে ঘোষণা করেছেন ‘জিরো ইনফ্লেশন’ বা ‘শূন্য মূল্যস্ফীতি’ প্রকল্প। তেহরানের প্রায় ৯৫ লাখ বাসিন্দাকে ১২ ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটি নির্দিষ্ট খাদ্যঝুড়ি সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়েছেন তিনি। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, প্রকল্পের মেয়াদে এসব পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রাখা হবে।

তবে শহর ও গ্রাম পরিষদের সপ্তম দফার নির্বাচনের আগে এমন উদ্যোগ সামনে আসায় এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে তেহরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে সরকারপন্থীদের ‘জাকানি বীর, ধন্যবাদ! ধন্যবাদ!’ স্লোগান পরিস্থিতিকে আরও আলোচনায় এনেছে। তেহরান সিটি কাউন্সিলের সদস্য মেহদি এগরারিয়ান মনে করেন, একটি উচ্চকণ্ঠ সংখ্যালঘু গোষ্ঠী জাকানিকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তার ভাষায়- জাকানি দ্বিতীয় মাহমুদ আহমাদিনেজাদ হিসেবে পরিচিত হতে আগ্রহী।

‘শূন্য মূল্যস্ফীতি’ প্রকল্পে কী আছে?

জাকানির ঘোষিত প্রকল্পে চাল, পাস্তা, লাল মাংস, ভোজ্যতেল, সয়া, খেজুর, চিনি এবং পাঁচ ধরনের ডালসহ মোট ১২টি পণ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মেয়রের দাবি, তেহরানের প্রায় ৯৫ লাখ মানুষ এ খাদ্যঝুড়ির সুবিধা পাবেন। প্রকল্পের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।

ইরানওয়্যারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জাকানি প্রচলিত নগরসেবার বাইরেও বিভিন্ন খাতে হস্তক্ষেপের উদ্যোগ নিয়েছেন। ২০২১ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সামাজিক উন্নয়ন, আবাসন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সন্তান জন্মদান, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো বিষয়ে পৃথক ‘ক্যাম্প’ বা বিশেষ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র গড়ে তোলেন।

তবে নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে সিটি কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়াই এবং নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ না রেখে প্রকল্পটি শুরু করা হয়েছে। জাকানি সম্প্রতি সিটি কাউন্সিলের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে জানিয়েছেন, প্রকল্পের অর্থ আসবে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল, নগরীর ‘শাহরভান্দ’ কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, ব্যাংকঋণ এবং মেল্লাত ও শাহর ব্যাংকের সহযোগিতা থেকে।

মূল্যস্ফীতি ১০৮ শতাংশ ছাড়ানোর বাস্তবতা

ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এমনিতেই সংকটপূর্ণ। দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১০৮ দশমিক ৮ শতাংশ। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি ব্যক্তির জন্য মাসে ১০ লাখ তুমান সমমূল্যের ইলেকট্রনিক খাদ্যভাতা চালু করা হলেও তা মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে জাকানির প্রকল্পকে সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের সহায়তা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে পণ্য পাওয়া নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। তেহরানের একজন বাসিন্দা ইরানওয়্যারকে জানিয়েছেন, প্রকল্পের প্রচার শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও ফলমূল ও সবজির বাজার কিংবা শাহরভান্দের দোকানে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এসব পেতে হলে ‘শাহরজাদ’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন করে আবেদন করতে হচ্ছে।

২৩ হাজার কোটি তুমানের আর্থিক হিসাব

ইরানি সংবাদমাধ্যম ‘জুমান’ প্রকল্পটির সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব নিয়ে একটি হিসাব প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত পণ্যের পরিমাণ এবং অন্যান্য পণ্যের সম্ভাব্য ব্যবহার বিবেচনায় স্থিরমূল্যে খাদ্যঝুড়িটির মাসিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২৮ লাখ ২৭ হাজার তুমান। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকলে একই খাদ্যঝুড়ির মূল্য বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ৩৫ লাখ ৩৮ হাজার তুমানে পৌঁছাতে পারে।

৯৫ লাখ মানুষের জন্য নির্ধারিত পণ্য ও পরিমাণ ধরে জুমান সম্ভাব্য মূল্যপার্থক্য বা ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ২৩ হাজার কোটি তুমান (২৩ ট্রিলিয়ন তুমান) বলে অনুমান করেছে। তবে এটি সিটি করপোরেশনের ঘোষিত বা চূড়ান্ত ব্যয় নয়; সংবাদমাধ্যমটির নিজস্ব হিসাব। প্রকৃত বরাদ্দ, পণ্যের সরবরাহ এবং পরিবারের বাস্তব চাহিদার পরিমাণও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

বাজারে সংকট তৈরির আশঙ্কা

প্রকল্পটি নিয়ে সিটি কাউন্সিলের সমালোচকদের অন্যতম উদ্বেগ হলো, মেয়র বিপুল পরিমাণ পণ্য আগাম কিনে গুদামে মজুত করলে বাজারে সরবরাহ কমে যেতে পারে। এতে উল্টো পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সিটি কাউন্সিলের সদস্য মেহদি এগরারিয়ান সংবাদমাধ্যম খবরঅনলাইনকে বলেন, এ ধরনের উদ্যোগের কারণে বাজারব্যবস্থায় ভারসাম্য নষ্ট হওয়া কিংবা পণ্যের সংকট তৈরি হওয়া উচিত নয়।

তার আশঙ্কা, সিটি করপোরেশন আগাম পণ্য কিনে গুদামে মজুত করলে বাজারে সরবরাহ কমে যেতে পারে। এতে কোনো কোনো পণ্য আরও দামি হয়ে উঠতে পারে কিংবা বাজারে সহজে পাওয়া নাও যেতে পারে। কারণ, বাজারের মূলনীতি হলো চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য। প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার বক্তব্য, এই খাদ্যঝুড়ির অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সিটি কাউন্সিলের অন্য সদস্য নাসের আমানি এবং জাফর তাশকরি হাশেমিও প্রকল্পটির সমালোচনা করেছেন। হাশেমি এটিকে নির্বাচনে ভোট পাওয়ার কৌশল হিসেবে দেখছেন।

অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন: ছয় মাস পর কী হবে?

অর্থনীতিবিদদের একটি অংশও জাকানির উদ্যোগের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অর্থনীতিবিদ দাউদ সুরি মনে করেন, এমন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে অর্থের উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। ছয় মাসের মেয়াদ শেষ হলে প্রকল্পের কী হবে, সেটিও পরিষ্কার করতে হবে। তার মতে, শুধু প্রকল্প শুরু করাই যথেষ্ট নয়; এর ধারাবাহিকতা, আর্থিক দায় এবং অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।

আরেক অর্থনীতিবিদ জাফর খাইরখাহান বলেছেন, মূল্যস্ফীতির মূল কারণ নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় নীতিগত হাতিয়ার তেহরান সিটি করপোরেশনের হাতে নেই। ফলে মেয়রের পক্ষে সরাসরি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর সমালোচনার জবাবে জাকানি পৌরসভা আইনের ৫৫ নম্বর ধারার উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ফলমূল ও সবজির বাজার পরিচালনার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সিটি করপোরেশন বাজারে একটি ‘মূল্য-নোঙর’ বা দাম স্থিতিশীল রাখার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে।

বিনা মূল্যে মেট্রো-বাস, ক্ষতির হিসাব কত?

জাকানির আগের সিদ্ধান্তগুলো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে মেট্রো ও বাসে বিনা মূল্যে যাতায়াতের ব্যবস্থা চালুর আর্থিক প্রভাব নিয়ে তেহরানের সাবেক মেয়র পিরুজ হানাচি সমালোচনা করেছেন। ইনসাফ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বিনা মূল্যে গণপরিবহন চালু রাখার ফলে তেহরান সিটি করপোরেশনের বছরে ছয় হাজার কোটি তুমানের বেশি স্থায়ী রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

হানাচির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে অবকাঠামোগত ব্যয় বাদ দিয়েই মেট্রোর একটি টিকিটের প্রকৃত মূল্য ছিল প্রায় ছয় হাজার তুমান। অবকাঠামোর ব্যয় যুক্ত করলে তা ১২ হাজার তুমানের বেশি দাঁড়াত। বর্তমান মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে প্রকৃত ব্যয় আরও অনেক বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তার দাবি, টিকিটের মূল্য শূন্য করে দেওয়ার ফলে গণপরিবহন ব্যবস্থার আয় কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে সেবার মান, ট্রেন চলাচলের মধ্যবর্তী সময় এবং যানবাহন ব্যবস্থাপনার ওপর। হানাচি এই নীতিকে অতীতে সংসদে পেট্রলের দাম দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, ওই সিদ্ধান্তের পরিণতিতে ২০১৯ সালে ব্যাপক সামাজিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল।

আহমাদিনেজাদের জনপ্রিয়তার রাজনীতি?

জাকানির ‘শূন্য মূল্যস্ফীতি’ প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত সমালোচনা হলো, এটি জনপ্রিয়তা অর্জনের রাজনৈতিক কৌশল কি-না। ইরানওয়্যারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাকানির এসব উদ্যোগের মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের শাসনামলের জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন সমালোচকেরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বাবাক দরবিকি ইরানওয়্যারকে বলেন, দেশের চারদিকে যখন সংকট, তখন কট্টরপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে বিভিন্ন উপায় ব্যবহার করছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানে বিপুল আর্থিক সম্পদ ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ জড়িত থাকায় সেখানে এমন তৎপরতার সুযোগ বেশি। তার বক্তব্য, বর্তমান অস্থিরতার মধ্যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের অনুকূলে নিতে চাইছে।

তেহরানের মেয়র হিসেবে জাকানির মেয়াদও স্বাভাবিক সময়সূচি অনুযায়ী শেষ হওয়ার কথা ছিল। ২০২৬ সালের ১ মে সপ্তম দফার শহর ও গ্রাম পরিষদ নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ায় নির্বাচন পিছিয়ে যায়। ফলে জাকানি ও অন্যান্য মেয়রের দায়িত্বকালও অব্যাহত রয়েছে।