ইরানের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এখন মোহসেন রেজাইয়ের হাতে। দীর্ঘদিন সামরিক নেতৃত্বে থাকা এই নেতা শান্তিকালীন রাজনীতিতেও নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত তাকে আবারও সামরিক ও নিরাপত্তা সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। নিজের দীর্ঘদিনের একটি লক্ষ্য পূরণের সুযোগও তৈরি হয়েছে তার সামনে।
২০২৫ সালের ১৭ জুন ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ চলাকালে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে হাজির হয়েছিলেন রেজাই। তখন তার পরনে ছিল ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সামরিক পোশাক। ওই অনুষ্ঠানে তিনি দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনির কাছে প্রতিরক্ষার কাজে আরও সরাসরি যুক্ত হওয়ার দায়িত্ব চেয়েছিলেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং একসময় আইআরজিসির প্রধান কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করা রেজাই বলেছিলেন, তিনি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্মুখসারিতে থেকে দেশের প্রতিরক্ষায় ভূমিকা রাখতে চান।
তার সেই অনুরোধ পূরণ করেন ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ মোজতবা খামেনি। চলতি বছরের ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় তার বাবার মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন মোজতবা। এরপর ৯ আগস্ট তিনি রেজাইকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন। একই দিনে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাকে ওই কাউন্সিলের সচিবের দায়িত্ব দেন। এর মধ্য দিয়ে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার শীর্ষ দায়িত্বে আসেন রেজাই।
ইরানের সামরিক নেতৃত্বে রেজাইয়ের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার ছিলেন। ১৯৯৭ সালে সেই দায়িত্ব ছাড়ার পর সামরিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরির চেষ্টা করেন। কয়েকবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সফল হননি। নির্বাচনী প্রচারে প্রায়ই নিজেকে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতেন। অব্যবস্থাপনা ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে চাপে রয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ ছিল রেজাইয়ের আইআরজিসি কমান্ডারের দায়িত্ব ছাড়ার পর ইরানের প্রথম বড় সরাসরি সামরিক সংঘাত। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও অল্প সময়ের জন্য অংশ নেয় এবং মধ্য ইরানের ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। তবে নিবন্ধটির ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানো, দেশটির সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা কিংবা পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবারও ইরানে হামলা চালায়। নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর প্রভাব খাটিয়ে ওয়াশিংটনকে আরও সরাসরি যুদ্ধে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে। এ ক্ষেত্রে কুখ্যাত যৌন পাচারকারী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক ব্ল্যাকমেইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করা হয়েছিল বলে লেখায় দাবি করা হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে নিবন্ধে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি। যুদ্ধ শুরুর পাঁচ মাসের কিছু বেশি সময় পর ইরানের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয় রেজাইকে।
নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর সামরিক কিংবা কূটনৈতিক কোনো ক্ষেত্রেই আত্মসমর্পণের পথে না যাওয়ার অবস্থান ধরে রেখেছেন রেজাই। তবে তার লক্ষ্য এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে নিবন্ধটিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তার ধারণা, সামরিক শক্তিতে অনেক এগিয়ে থাকা প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাতে শক্তির ভাষাতেই কার্যকরভাবে অবস্থান জানাতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো প্রতিপক্ষকে যুদ্ধের মূল্য তাদের নিজেদের দুর্বল জায়গায় অনুভব করানোর কৌশলেই গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
এর আগে ইরানের নিরাপত্তা ও সামরিক নেতৃত্ব হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করেছে। পারস্য উপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল এই প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাজারে যায়। ফলে হরমুজে চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়তে পারে। রেজাইও এই কৌশলকে আরও বিস্তৃতভাবে প্রয়োগ করতে চান বলে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত ড্রপসাইটকে দেওয়া এক বিশেষ লিখিত সাক্ষাৎকারে রেজাই বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রয়েছে। যুদ্ধ শুরু হলে কেবল সামরিক স্থাপনাই নয়, যোগাযোগের কেবল, তথ্যকেন্দ্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট স্থাপনাও ইরানের হামলার আওতায় আসতে পারে। তিনি বলেন, সংঘাত আবার শুরু হলে ইরানের হাতে আরও বিস্তৃত পরিকল্পনা থাকবে।
কূটনীতির পথও পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে চান না রেজাই। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান আসবে, এমন নিশ্চয়তা নিয়েও তিনি আশাবাদী নন। তার ভাষায়, কূটনীতি যদি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, তাহলে ইরান সেটিকেই অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু যুদ্ধ চলতে থাকলে পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সক্ষমতা দেশটির রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা শুরু হতে পারে, এমন আশঙ্কার কথাও নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে দেশটির প্রতিরক্ষার ধরন অনেকাংশে নির্ভর করতে পারে রেজাইয়ের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের ওপর। দীর্ঘদিন নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র থেকে দূরে থাকার পর তার হাতে এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এসেছে। ফলে তার নেতৃত্বে ইরানের প্রতিরক্ষাকৌশলে নতুন ধরনের পরিকল্পনা ও অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ দেখা যেতে পারে বলে নিবন্ধটির লেখক মনে করছেন।
সামরিক ও রাজনৈতিক, দুই ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময় কাটানো রেজাইয়ের সামনে এখন নিজের সামরিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে একের পর এক সংঘাত এবং সরকার পরিবর্তনের আহ্বানের মুখে তার দায়িত্বের পরিধি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন সামরিক পোশাক পুরোপুরি তুলে না রাখার পেছনে যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তা বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছেন বলেই নিবন্ধটির মূল বক্তব্য। সূত্র: ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি
নিষেধাজ্ঞার আড়ালে অস্ত্রভান্ডার কীভাবে সচল রাখলো ইরান?
যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় ইরানের গোপন সামরিক সরবরাহ নেটওয়ার্ক
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে তেহরানে কাতারের প্রতিনিধি দল
ইরানের সাত শর্ত মেনে না নিলে আলোচনায় অগ্রগতি হবে না: গালিবাফ