যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২৫০ ফুট (প্রায় ৭৬ মিটার) উঁচু বিজয়তোরণ নির্মাণে কেন্দ্রীয় অনুমোদন দিয়েছে ন্যাশনাল ক্যাপিটাল প্ল্যানিং কমিশন (এনসিপিসি)। তবে প্রকল্পটির বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিরোধীরা। তাঁদের আশঙ্কা, তোরণটি আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্র ও লিংকন মেমোরিয়ালের ঐতিহাসিক দৃশ্যপট আড়াল করবে।
বৃহস্পতিবার প্রায় নয় ঘণ্টার জনমত গ্রহণের পর কমিশন ৮-৪ ভোটে প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহ থেকেই নির্মাণকাজ শুরু হতে পারে। তবে প্রকল্প বন্ধে একাধিক মামলা হওয়ায় কাজ কবে শুরু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
কমিশনের ট্রাম্প-মনোনীত সদস্যরা তোরণটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্যদের প্রতি উপযুক্ত শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কমিশনের চেয়ারম্যান মার্ক পাওলেটা বৈঠকে বলেন, জাতীয় পরিচয় তুলে ধরতে বড় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের গুরুত্ব প্রেসিডেন্ট উপলব্ধি করেন। তাঁর মতে, প্রস্তাবিত স্থাপনাটি জাতীয় গৌরব ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সম্মান জানাবে। পাশাপাশি আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্রের জন্য একটি স্মারক প্রবেশদ্বার তৈরি করবে।
প্রস্তাবিত স্থাপনাটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আর্ক দ্য ট্রাম্প’। প্যারিসের বিখ্যাত ‘আর্ক দ্য ত্রিয়ম্ফ’-এর নামের আদলে এই নামকরণ। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীকে নিজের পছন্দমতো সাজানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এটি নির্মাণ করতে চান ট্রাম্প।
প্রকল্পের নকশায় তোরণের শীর্ষে সোনালি ডানাযুক্ত ‘লেডি লিবার্টি’র ভাস্কর্য রাখার কথা রয়েছে। এর দুই পাশে থাকবে দুটি সোনালি ঈগলের ভাস্কর্য। স্থাপনাটির দুই পাশে সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে ‘ওয়ান নেশন আন্ডার গড’ এবং ‘লিবার্টি অ্যান্ড জাস্টিস ফর অল’।
ট্রাম্প এর আগে তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, বিশ্বের ৫৯টি বড় শহর ও রাজধানীর মধ্যে ওয়াশিংটনই একমাত্র শহর, যেখানে বিজয়তোরণ নেই। তবে কোন ৫৯টি শহর বা রাজধানীর কথা তিনি বলেছেন, তা নির্দিষ্ট করেননি।
প্রশাসনের দাবি, তোরণটি শুধু স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে নয়, সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণের স্থাপন হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। এতে স্নাইপার মোতায়েন এবং ড্রোন ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, বিশ্বে এ ধরনের স্থাপনার কোনো নজির থাকবে না।
সমাধিক্ষেত্রের দৃশ্য আড়াল হওয়ার আশঙ্কা
প্রকল্পের বিরোধীরা বলছেন, তোরণটি আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্রের দৃশ্যপট বাধাগ্রস্ত করবে। সেখানে সমাহিত রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের হাজারো সেনাসদস্য ও সামরিক কর্মকর্তা। একই সঙ্গে লিংকন মেমোরিয়ালসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ঐতিহাসিক দৃশ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে ২৯ বছর কাজ করা এবং কূটনৈতিক বিভাগে দায়িত্ব পালন করা অ্যান রাইট বিবিসিকে বলেন, নির্মাণকাজ শুরু হলে তা ঠেকানোর চেষ্টা করবেন তাঁরা।
তিনি বলেন, ‘আমরা বুলডোজারের সঙ্গে নিজেদের বেঁধে রাখব। আমাদের মধ্যে হুইলচেয়ারে থাকা সাবেক সেনাসদস্যও আছেন। আমরা সেগুলো নির্মাণযন্ত্রের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখব।’
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রসঙ্গ টেনে রাইট বলেন, যুদ্ধ ও ব্যক্তিগত অহংকেন্দ্রিক ট্রাম্পের নীতি প্রত্যাখ্যান করেছে জনগণ।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় দায়িত্ব পালন করা সাবেক বিমানবাহিনীর সদস্য জন পোমেরয়ও প্রকল্পটির বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বাবা-মাকে আর্লিংটন সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হয়েছে। পোমেরয়ের মতে, তোরণটি সমাধিক্ষেত্রে যাওয়ার সময়কার গাম্ভীর্য ও নীরব পরিবেশকে ক্ষুণ্ন করবে।
তোরণের ভেতরে সামরিক সরঞ্জাম রাখার পরিকল্পনাকে তিনি ‘অপরিণত ধারণা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর আশঙ্কা, এ ধরনের স্থাপনা সন্ত্রাসী হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। নির্মাণকাজ শুরু হলে তা বাধাগ্রস্ত করারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পটির বিরুদ্ধে পরিবেশগত প্রভাব, যানজট ও নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক মামলা হয়েছে। তোরণ নির্মাণে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জ্যারেড হাফম্যান কমিশনের কাছে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, তোরণটি শুধু আর্লিংটনের নয়, লিংকন মেমোরিয়ালের দৃশ্যপটও বাধাগ্রস্ত করবে। তাঁর মতে, স্থাপনাটি এমন একটি ঐতিহাসিক দৃশ্যের ঐক্য ও ত্যাগের বার্তাকে ভেঙে দেবে, যা আমেরিকান জনগণের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত।
তিনি আরও বলেন, সম্রাট ও রাজারা নিজেদের স্মরণীয় করে রাখতে যে ধরনের বিশাল তোরণ নির্মাণ করতেন, এই প্রকল্পও সেই ধারণার সঙ্গে মেলে। তাঁর ভাষায়, এটি মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি স্থাপনা।
ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের একাধিক নির্মাণ প্রকল্প
রাজধানী ওয়াশিংটনকে নতুনভাবে সাজাতে আরও কয়েকটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে নতুন বলরুম নির্মাণের পরিকল্পনাও এর মধ্যে রয়েছে। প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এ প্রকল্প নিয়েও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে তাঁর প্রশাসন।
এ ছাড়া ১০৬ বছরের পুরোনো একটি গলফ কোর্স সংস্কারের পরিকল্পনা নিয়েও আদালতে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ট্রাম্প ওই এলাকাকে ‘ট্র্যাশ আইল্যান্ড’ বলে উল্লেখ করেছেন।
সব মিলিয়ে, বিজয়তোরণ নির্মাণে কমিশনের অনুমোদন মিললেও প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখনো আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে রয়েছে। বিক্ষোভকারীরা নির্মাণকাজ শারীরিকভাবে বাধাগ্রস্ত করার হুমকি দেওয়ায় ওয়াশিংটনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।