পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে খামেনির বার্তা পৌঁছে দিলেন মোহসেন রেজায়ি

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪০ এএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হওয়ার মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) মস্কোয় অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির একটি চিঠিও পুতিনের হাতে পৌঁছে দেন তিনি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসন’ বন্ধে রাশিয়ার সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

বৈঠক শেষে রেজায়ি বলেন, পুতিনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং অঞ্চলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও তাৎপর্যপূর্ণ কথাবার্তা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে ইরান পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়টি রয়েছে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব রেজায়ি বলেন, খামেনি যত দ্রুত সম্ভব তাঁর বার্তাটি পুতিনের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। প্রায় এক মাস আগেই মস্কো সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে অঞ্চলের সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিনের আলোচনার কারণে সফর পিছিয়ে যায়। খামেনির চিঠিতে কী লেখা ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।

এর আগে বুধবার দেওয়া এক লিখিত বিবৃতিতে খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনোভাবেই নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ইরানকে আরও শক্তিশালী করে ‘চূড়ান্ত প্রতিরোধ সক্ষমতা’ অর্জনের ওপর জোর দেন তিনি।

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ৭ শর্ত

পুতিনের সঙ্গে রেজায়ির বৈঠক এমন সময়ে হলো, যখন ইরানের যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে কাতার। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ওয়াশিংটন আবারও ইরানে হামলা শুরু করতে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যেই এ উদ্যোগ চলছে।

মঙ্গলবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে। অনেকেই এ মূল্যবৃদ্ধির জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করছেন।

যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে কৌশলগত হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং দেশটির পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করা।

রেজায়ি বৃহস্পতিবার বলেন, যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করবে না ইরান, যতক্ষণ না ওয়াশিংটন তেহরানের দেওয়া সাতটি শর্ত পূরণ করছে।

তিনি বলেন, কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সাতটি শর্ত জানানো হয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না এবং আলোচনাও শুরু হবে না।

রেজায়ির ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধে সহযোগিতা করতে রাশিয়া প্রস্তুত বলে পুতিন আবারও জানিয়েছেন। এর আগে গত মাসে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনালাপে যুদ্ধ বন্ধে সম্ভব সবকিছু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট।

ক্রেমলিনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাশিয়া থেকে ইরানে গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন নির্মাণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান রেজায়ি। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ইরানের গ্যাসসংকট মোকাবিলায় সহায়তা মিলবে। পাশাপাশি ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে গ্যাস বিক্রির সুযোগ পাবে রাশিয়া।

রেজায়ি আরও জানান, অক্টোবরের শেষ দিকে তেহরানে ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠক সম্পর্কে পুতিনকে অবহিত করেছেন তিনি। রুশ প্রেসিডেন্ট ওই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।

রেজায়ি বলেন, চীনের মতো রাশিয়াও মনে করে, অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাইরের দেশগুলোর হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস জানিয়েছে, ক্রেমলিনের সিনেট প্যালেসে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বৈঠক নিয়ে রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি।

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কুয়েত, সৌদি আরব, ওমান, কাতার, তুরস্ক ও জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এসব আলোচনায় আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে কথা হয়েছে।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা রাশিয়া ও ইরান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দেশ দুটি বাণিজ্য, সামরিক সহযোগিতা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয়ের জন্য একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে। ওই বছরের অক্টোবরে চুক্তিটি কার্যকর হয়। তবে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার চুক্তির মতো এতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহায়তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

এদিকে গত শনিবার ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানিয়েছেন, রাশিয়ার কাছ থেকে এসইউ-৩৫ যুদ্ধবিমান কিনেছে ইরান। যুদ্ধ শেষ হলে বিমানগুলো পাওয়ার আশা করছে তেহরান।

ইরানি সংবাদমাধ্যম তাবনাককে তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগেই এসব যুদ্ধবিমান সরবরাহের কথা ছিল। বিমান গ্রহণের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং পাইলটদের প্রশিক্ষণও সম্পন্ন হয়েছে।

সূত্র: আল-জাজিরা

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত