মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল 'ডেটা সেন্টার বিরোধী' জনমতের প্রতিফলন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিস্তার এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটেছে। দেশজুড়ে ডেটা সেন্টার নির্মাণ সীমিত বা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ভোট দিয়েছেন অধিকাংশ এলাকার ভোটাররা। বিশ্লেষকদের মতে, ডেটা সেন্টার নিয়ে উদ্বেগ এখন আর কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং জীবনযাত্রার ব্যয়, বিদ্যুতের দাম, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকির সঙ্গে বিষয়টি জড়িয়ে পড়েছে।

গত সেপ্টেম্বরের এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ শতাংশ ডেমোক্র্যাট ও ৫৭ শতাংশ রিপাবলিকান নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ সীমিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই জনমতের প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে নজর ছিল বিশ্লেষকদের।

নির্বাচনে দেশজুড়ে ডেটা সেন্টার-সংশ্লিষ্ট ৪১টি ব্যালট উদ্যোগ বা গণভোটের প্রস্তাব ছিল। রেডবাড কনসাল্টিং পরিচালিত নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রকল্প ‘ডেটা সেন্টারস অন দ্য ব্যালট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভোটের ফলাফলে প্রায় সব ক্ষেত্রেই ডেটা সেন্টার নির্মাণ প্রত্যাখ্যান বা সীমিত করার পক্ষে জনমত দেখা গেছে। দুটি এলাকার ভোট গণনা চললেও সেখানেও একই ধরনের ফল আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ব্যতিক্রম ছিল নর্থ ডাকোটার ছোট শহর হারউড। ৮০০ জনেরও কম জনসংখ্যার শহরটিতে ডেটা সেন্টারসহ বড় শিল্প প্রকল্প নির্মাণের আগে স্বাধীন পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন বাসিন্দারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়েছে, ডেটা সেন্টার নিয়ে আপত্তি এখন দ্বিদলীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এআইয়ের কারণে চাকরির বাজারে পরিবর্তনের আশঙ্কার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার, স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর চাপ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির উদ্বেগও এতে ভূমিকা রাখছে।

এআইয়ের বিস্তারে ডেটা সেন্টার নির্মাণের চাপ

পিউ রিসার্চ সেন্টারের এপ্রিলের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে তখন প্রায় ৩ হাজার ডেটা সেন্টার ছিল। আরও ১ হাজার ৫০০টির বেশি নির্মাণাধীন বা নির্মাণের প্রক্রিয়ায় ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ এই নির্মাণযজ্ঞের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি।

টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল বিজনেস বিভাগের ডিন ভাস্কর চক্রবর্তী আলজাজিরাকে বলেন, এআইয়ের দ্রুত ও নিয়ন্ত্রণহীন বিকাশ নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানুষের আশঙ্কা, এআই তাদের চাকরির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকার আশপাশে ডেটা সেন্টার নির্মাণের মাধ্যমে প্রযুক্তিটির প্রভাব সরাসরি চোখে পড়ছে।

চক্রবর্তীর মতে, ডেটা সেন্টারের কারণে সম্ভাব্য বিদ্যুৎ ও পানির সংকট এবং বাড়তি খরচ নিয়েও মানুষ উদ্বিগ্ন। এসব স্থাপনায় বিপুল পরিমাণ পানি ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ বা শুল্কনীতির মতো বৃহত্তর কারণেও জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। তবে বিদ্যুৎ গ্রিডে এআই খাতের বাড়তি চাহিদাও ডেটা সেন্টারগুলোর প্রতি মানুষের অসন্তোষের একটি কারণ। এর প্রভাব অনেকেই নিজেদের বিদ্যুৎ বিলের মধ্য দিয়ে অনুভব করছেন।

ডালাসের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের ২০২৬ সালের একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ডেটা সেন্টারের কারণে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৬ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছিল।

স্বাধীন ডেটা সেন্টার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মেট্রো কলো অ্যাডভাইজরির প্রতিষ্ঠাতা জেমস মার্সার আলজাজিরাকে বলেন, সম্ভাব্য বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের সংগঠিত করেছে। তাঁর ভাষ্য, একটি ডেটা সেন্টারের বিদ্যুতের চাহিদা ছোট একটি শহরের সমান হতে পারে। অথচ সেই স্থাপনার খরচ শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ বিলের ওপর চাপ তৈরি করবে—এমন আশঙ্কা থেকেই মানুষ প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

মার্সার বলেন, এ কারণেই বিভিন্ন কাউন্টিতে নতুন প্রকল্পের অনুমোদন স্থগিত রাখা, ভূমি ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে বিরোধ এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণকে কেন্দ্র করে গণভোটের মতো ঘটনা দ্রুত বাড়ছে।

নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ডেটা সেন্টার

জনগণের এই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী আসনে প্রার্থীরা এআই ও ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিষয়টিকে প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।

ওহাইওতে রিপাবলিকান জন হাস্টেডকে হারিয়ে সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ আসনটি পুনরুদ্ধার করেন ডেমোক্র্যাট শেরড ব্রাউন। চলতি বছর ডেটা সেন্টার-সংশ্লিষ্ট গণভোট ও উদ্যোগের সবচেয়ে বেশি আয়োজন হয়েছিল এই অঙ্গরাজ্যে। ২০২৬ সালে দেশজুড়ে ৪৭টি গণভোট ও প্রস্তাবের মধ্যে ২১টিই ছিল ওহাইওতে।

সাবেক সিনেটর ব্রাউন তাঁর প্রচারে ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণে হাস্টেডের সমর্থনকে বড় ইস্যু করেন। চলতি বছরের শুরুর দিকে এনবিসি নিউজকে তিনি বলেন, ডেটা সেন্টার নির্মাণের পক্ষে যিনি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন, তিনি হলেন জন হাস্টেড।

টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা নতুন ডেটা সেন্টারের অনুমোদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার আহ্বান জানান। স্থানীয় জনগণের সুরক্ষায় আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল রাখার পক্ষে ছিলেন তিনি। প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তাঁর অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত গভর্নর নির্বাচনে বর্তমান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করেন হিনোজোসা।

ইয়র্কভিল আইভস ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড্যান আইভস এক বিশ্লেষণী নোটে বলেন, অ্যাবট বর্তমানে টেক্সাসে ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থগিতাদেশ দিলেও পুনর্নির্বাচিত হলে তা প্রত্যাহার করা হতে পারে—এমন ধারণা ছিল। অন্যদিকে, হিনোজোসা ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের বিরোধী হিসেবে পরিচিত। ফলে টেক্সাসে এআই অবকাঠামো নির্মাণের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ডেমোক্র্যাটদের আরেক বিজয়ী প্রার্থী সিনেটর-ইলেক্ট জেমস টালারিকোও ডেটা সেন্টারের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত একটি আসন জয় করেন।

এআই অবকাঠামোর পানির চাহিদা নিয়ে টেক্সাসে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। এর উদাহরণ করপাস ক্রিস্টি শহর। চলতি বছরের শুরুর দিকে তীব্র খরার কারণে শহরটির জলাধারে পানির পরিমাণ মোট ধারণক্ষমতার মাত্র ৮ শতাংশে নেমে এসেছিল। শহরটিতে পানীয় জলের সংকট দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়।

টালারিকো ডেটা সেন্টারে পানির ব্যবহার কমাতে ক্লোজড-লুপ বা পুনঃসঞ্চালনভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা চালুর প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়নের আহ্বান জানান। করপাস ক্রিস্টিতে তিনি ১২ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হন।

সিনেটের আরেক নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ এআই খাতের কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দেন। নির্বাচনে তিনি ৫২ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেন।

এআই খাতে বাড়তে পারে সরকারি নজরদারি

কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এআই শিল্পের ওপর আইনপ্রণেতাদের নজরদারি বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গুগল ডিপমাইন্ডের সাবেক গবেষক অ্যালেক্স টার্নার আলজাজিরাকে বলেন, এআই খাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা এখন বেশি। দলমত নির্বিশেষে এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী কংগ্রেস সদস্যদের পরামর্শ দিতে তিনি প্রস্তুত বলেও জানান।

গত ছয় মাসে কয়েকটি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনার পর এআইকে জাতীয় নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তার ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন কংগ্রেসের নেতারা। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি ঘটনায় ওপেনএআইয়ের স্বয়ংক্রিয় এজেন্ট নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার পরিবেশ থেকে বেরিয়ে প্রযুক্তি স্টার্টআপ হাগিং ফেসের সিস্টেমে প্রবেশ করে। অন্য একটি ঘটনায় এআই এজেন্ট অনুমতি ছাড়াই ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের সুযোগ পায়।

অক্টোবরের শেষ দিকে অ্যানথ্রপিকের ক্লড এআই মডেল জর্জিয়ার ভোটারদের তথ্যেও প্রবেশ করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আগামী ৩ জানুয়ারি ১২০তম কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হলে ডেমোক্র্যাটরা এআই খাতের অনিয়ম ও ঝুঁকি তদন্তে কংগ্রেসের তদারকি কমিটিগুলোকে কাজে লাগাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার রাতে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়ার আভাস পাওয়ার পর ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর এড মার্কি নতুন তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, তদন্তের জন্য এত বেশি সমন জারি করা হবে যে সেগুলো ছাপাতে নতুন বন লাগাতে হবে।

অ্যারিজোনার কংগ্রেস সদস্য ইয়াসামিন আনসারিও এআইয়ের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান জানান। তাঁর মতে, ডেমোক্র্যাটদের প্রথম দিনের কর্মসূচিতে উন্নত এআইয়ের বিকাশ সাময়িক স্থগিত, নিয়ন্ত্রণহীন শিল্পটির ওপর বিধিনিষেধ এবং কৃত্রিম সুপারইন্টেলিজেন্স নিষিদ্ধ করার বিষয়টি থাকা উচিত।

উদ্বেগ কমাতে উদ্যোগ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর

নির্বাচনের ফলাফলের পর ভোটারদের উদ্বেগ কমাতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্ন প্রস্তাব সামনে আনছে। ওপেনএআই নির্বাচনের পর ‘সেটিং আ নিউ স্ট্যান্ডার্ড ফর রেসপনসিবল এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ শিরোনামে একটি কাঠামো প্রকাশ করে। এতে প্রতিষ্ঠানটি ডেটা সেন্টারে ক্লোজড-লুপ বা কম পানি ব্যবহারকারী শীতলীকরণ ব্যবস্থা অগ্রাধিকার দেওয়ার এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোর খরচ নিজেরাই বহনের অঙ্গীকার করেছে।

মঙ্গলবারের নির্বাচনের কয়েক দিন আগে ওপেনএআই তাদের ডেটা সেন্টারগুলোকে ‘কম্পিউট ক্যাম্পাস’ নামে পরিচিত করার উদ্যোগও নেয়।

নির্বাচনের প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারেও। বিনিয়োগকারীরা এআই খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আসার সম্ভাবনা দেখছেন। এর প্রভাবে প্রযুক্তি খাতের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে দরপতন হয়েছে।

বৃহস্পতিবার একদিনেই চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার বাজারমূল্য ৪৫০ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। তবে শুক্রবার লেনদেনের শুরুর দিকে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৪ শতাংশ বেড়েছিল। তারপরও আগের পাঁচ দিনের তুলনায় শেয়ারটির দর ৬ দশমিক ৮ শতাংশ কম ছিল।

ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান কোরউইভের শেয়ারেও বৃহস্পতিবার বড় পতন ঘটে। শুক্রবার তা ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়লেও আগের পাঁচ দিনের তুলনায় কোম্পানিটির শেয়ারের দর ১৬ শতাংশ কম ছিল।

সূত্র: আল-জাজিরা