হরমুজ প্রণালিতে ভারত-চীন-কাতার ও ইরাককে কেন ছাড় দিচ্ছে ইরান?

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১০ এএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইরান। তবে ভারত, চীন, কাতার ও ইরাকের জাহাজকে এ বিধিনিষেধের বাইরে রাখার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। এর বিনিময়ে ওষুধ, রাজনৈতিক সমর্থন ও রাজস্ব পাওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কৌশল দুর্বল করার লক্ষ্যও থাকতে পারে ইরানের।

মঙ্গলবার ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মুকাদ্দাম ইরানি স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সিকে (আইএসএনএ) বলেন, এই চার দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে চলাচল করতে পারছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এসব জাহাজ বাধা দিচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় তেহরান। এর পর জুলাইয়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে আবারও নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, কেন চারটি দেশকে চলাচলের ছাড় দিচ্ছে ইরান? যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকা অবস্থায় এসব দেশের জাহাজ কি সত্যিই নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে?

জাহাজ চলাচলের ছাড় দিয়ে কী পাচ্ছে ইরান?

হায়াত মুকাদ্দামের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে ওষুধ এবং চীনের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাবে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালানো কাতারের কাছ থেকেও তেহরান ইতোমধ্যে কূটনৈতিক সমর্থন পাচ্ছে।

তিনি জানান, ভারত ও চীনের জাহাজ থেকে ট্রানজিট ফি বা চলাচলের মাশুল আদায় করবে ইরান। তবে কাতারের জাহাজকে বিনা মাশুলে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে। ইরাকি জাহাজের ক্ষেত্রে কোনো মাশুল নেওয়া হবে কি না, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।

লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও মানবাধিকারবিষয়ক বিভাগের সহযোগী গবেষক এবং ইরান বিশ্লেষক রুজবেহ পারসি আলজাজিরাকে বলেন, ইরানের একজন আইনপ্রণেতা এই ছাড়ের পেছনে যে কারণই ব্যাখ্যা করুন না কেন, মূল প্রশ্ন হলো—এই ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরানের জন্য পণ্য বিনিময় ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে বাণিজ্য নতুন কিছু নয়। তবে এবার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে অবরোধের মধ্যে ফাঁক তৈরি করে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা আনা-নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহযোগী অধ্যাপক নাদের হাশেমির ধারণা, এসব জাহাজকে বাধাহীন চলাচলের সুযোগ দিতে ইরান সম্ভবত ট্রানজিট ফি অথবা পণ্যের মোট মূল্যের একটি অংশ আদায় করছে।

অস্ট্রিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাই আলজাজিরাকে বলেন, কয়েকটি কারণে ইরানের এই পদক্ষেপ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সফল হলে এ ব্যবস্থা থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করতে পারবে তেহরান।

তাঁর মতে, চীন ইরানের অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। দেশটির মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই কিনে থাকে চীন। পাশাপাশি কাতার ও ভারতের জাহাজকে ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকৌশলের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন দুর্বল করার চেষ্টা করছে ইরান। বিশেষ করে কাতারের জাহাজ থেকে কোনো মাশুল না নেওয়ার বিষয়টিও এ কৌশলের অংশ হতে পারে।

চার দেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?

ভারত, চীন, কাতার ও ইরাক—চারটি দেশই জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক মুয়ু শু আলজাজিরাকে জানান, অক্টোবরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন উপসাগরীয় দেশগুলোর ১ কোটি ২৩ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ গেছে চীনে এবং ১৩ শতাংশ ভারতে।

ইরান বিশ্লেষক রুজবেহ পারসির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে যাওয়ার সক্ষমতা চীনের তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে এ কারণে সম্ভাব্য রাজনৈতিক মূল্য দিতে বেইজিং কতটা প্রস্তুত, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এশিয়ার দেশগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব জ্বালানি সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়। ফলে জাহাজ চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করতে দেশগুলোর কাছে ইরানকে দেওয়ার মতো বিভিন্ন সুবিধাও রয়েছে।

পারসি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া ভারতের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়েছে। অন্যদিকে, ইরান নিজ দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন করতে পারে না—এমন ওষুধের বড় উৎপাদক ভারত। ফলে ওষুধ সরবরাহের বিষয়টি দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কাতারের কোনো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন হয়নি। তবে অক্টোবরে দেশটি ১৮ লাখ টন এলএনজি পরিবহন করতে পেরেছে।

একই সময়ে কাতারের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পরিমাণ দৈনিক ৫ লাখ ১৭ হাজার ব্যারেল থেকে কমে ১ লাখ ৯৩ হাজার ব্যারেলে নেমেছে। অন্যদিকে, ইরাকের ক্ষেত্রে তা দৈনিক ১৬ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল থেকে বেড়ে ২৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের দৈনিক সর্বোচ্চ ২০ লাখ ব্যারেলের উৎস শনাক্ত করতে পারেনি কেপলার। ফলে কাতার ও ইরাকের প্রকৃত পরিবহনের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে জানান শু।

পারসির মতে, ভারত ও কাতারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যা দেশ দুটি ধরে রাখতে চায়। তবে একই সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে তাদের হতাশাও রয়েছে। কাতারের জন্য ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাও অত্যন্ত জরুরি, কারণ দেশটি ইরানের প্রতিবেশী।

তাই হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দেওয়া ছাড় থেকে চারটি দেশই সুবিধা পেতে পারে। তবে এর সঙ্গে রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

এবারই কি প্রথম ছাড় দিচ্ছে ইরান?

পুরোপুরি নতুন কোনো পদক্ষেপ নয় এটি। যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরান নিজেদের বন্ধুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে এমন কয়েকটি দেশের জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সুযোগ দিতে শুরু করে। এপ্রিলে দেশটির সামরিক কমান্ড ইরাককে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ দেশ উল্লেখ করে জাহাজ চলাচলে ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক পুস্তাইয়ের মতে, ইরাককে এই সুবিধা দেওয়ার পেছনে প্রতিবেশী দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার উদ্দেশ্য থাকতে পারে। ইরান ও ইরাক—দুই দেশেই শিয়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কি এড়িয়ে চলতে পারবে জাহাজগুলো?

এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের অবস্থানের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের উপকূলীয় এলাকা ও বন্দরগুলোতে প্রবেশকারী কিংবা সেখান থেকে বের হওয়া সব দেশের জাহাজের ওপর অবরোধ কার্যকর। তবে ইরানের বন্দর এড়িয়ে চলা জাহাজ এই অবরোধের আওতায় পড়বে না।

সেন্টকম আরও জানিয়েছে, খাদ্য ও বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধসহ মানবিক সহায়তার পণ্য পরিদর্শনের পর চলাচলের অনুমতি পেতে পারে।

তবে হায়াত মুকাদ্দামের বক্তব্যে চার দেশের ছাড় শুধু উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য করা জাহাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে হয়নি। পুস্তাই বলেন, বিষয়টি সত্য হলে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর ওপরও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।

ওয়াশিংটন যদি ইরানের এই পদক্ষেপ মেনে নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে এবং এর কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে। বিশেষ করে চীন ও ভারতের যেসব জাহাজ ইরান থেকে পণ্য নিয়ে যাবে বা ইরানে পণ্য পৌঁছে দেবে, সেগুলোও ছাড়ের আওতায় এলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।

তবে ‘এই দেশগুলোর জাহাজ’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। জাহাজের পতাকা, মালিকানা, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নাকি অন্য কোনো সম্পর্কের ভিত্তিতে ছাড় দেওয়া হবে—সেটিও পরিষ্কার নয় বলে জানান পুস্তাই।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর শান্তি আলোচনায় বসার আগে ইরানের অন্যতম দাবি হলো নৌ অবরোধ প্রত্যাহার। এসব আলোচনায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিও আলোচনার বিষয় হতে পারে।

কাতারের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের একটি প্রস্তাব রয়েছে। এতে সাতটি শর্তের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।

পুস্তাইয়ের মতে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবাধ চলাচলের প্রশ্নটিকে তেল রপ্তানি ও পারমাণবিক কর্মসূচির আলোচনা থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা করছে। তবে এ কৌশল কতটা সফল হবে, তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

বিশ্ববাজারে তেলের দামে কতটা প্রভাব পড়বে?

বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত ইরানের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না।

বিনিয়োগ ও আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প আলজাজিরাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ছাড়ের প্রভাব সীমিত থাকবে। বাজার এখন আবারও শান্তিচুক্তির সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে হিসাব করছে।

তবে যুদ্ধ যদি আবার পূর্ণমাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ইরানের সামরিক কমান্ডারদের পক্ষে লক্ষ্যবস্তু বাছাইয়ের সময় আলাদা করে এসব দেশের জাহাজ শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। আপাতত বাজারের মূল মনোযোগ বৃহত্তর শান্তিচুক্তির সম্ভাবনার দিকে।

এদিকে, ইরানের ছাড় পেলেই জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। গত ৩০ অক্টোবর কাতারের এলএনজিবাহী জাহাজ ‘আল মায়েদা’ উপসাগরে অজ্ঞাত বস্তুতে আঘাতপ্রাপ্ত হয় বলে জানিয়েছে এর মালিক প্রতিষ্ঠান কাতার গ্যাস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) ও যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ওই অঞ্চলে ১২০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে অক্টোবর ছিল সবচেয়ে বেশি জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার মাস।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত