নিউজিল্যান্ডের উত্তর দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলে একসঙ্গে আটকা পড়ে মারা গেছে ৪৩টি পাইলট তিমি। উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাটিকে ‘কঠিন ও মর্মান্তিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিমিগুলোকে জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত একটিকেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টার কিছু পর উত্তর দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে কেপ প্যালিসারের কাছে এনগাউই উপকূলে তিমিগুলোর একটি দল আটকা পড়ার খবর পায় দেশটির সংরক্ষণ বিভাগ (ডিওসি)। সংস্থাটি ওই দিন সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিষয়টি জানায়।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠন প্রজেক্ট জোনাহ নিউজিল্যান্ড বৃহস্পতিবার বিকেলে জানায়, অন্তত ২০টি তিমি উপকূলে আটকা পড়েছিল। এর মধ্যে চারটি তখনো জীবিত ছিল। সংস্থাটি ডিওসি এবং স্থানীয় মাওরি আদিবাসীদের একটি গোষ্ঠী ‘আইউই’র সঙ্গে মিলে তিমিগুলোর শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা এবং জোয়ারের সময় জীবিত তিমিগুলোকে আবার সমুদ্রে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
তবে শুক্রবার বিকেলে দেওয়া এক হালনাগাদ তথ্যে ডিওসি জানায়, এনগাউই থেকে মাঙ্গাতোতোই উপকূল পর্যন্ত মোট ৪৩টি তিমি আটকা পড়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কোনো তিমিই বেঁচে নেই বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রজেক্ট জোনাহ জানায়, কয়েক কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত উপকূলীয় এলাকায় তিমিগুলোর অনেকগুলোকে উদ্ধারের আগেই মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। যেগুলো জীবিত ছিল, সেগুলোও দিনের বিভিন্ন সময়ে মারা যায়।
সংস্থাটি জানায়, উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া সবার জন্য ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও মানসিকভাবে কষ্টকর। প্রথমে স্থানীয় বাসিন্দারাই ঘটনাস্থলে পৌঁছে জীবিত তিমিগুলোর শরীর ঠান্ডা রাখা এবং যতটা সম্ভব স্বস্তিতে রাখার চেষ্টা করেন। তাঁদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে সংগঠনটি।
এদিকে ডিওসি জানিয়েছে, তিমিগুলোর মরদেহ সমাহিত করার ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় আইউই গোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করছে তারা। মাওরি সংস্কৃতিতে এসব তিমিকে মূল্যবান ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রতিকূল উপকূল ও দুর্গম অবস্থান
প্রজেক্ট জোনাহের ভাষ্য, উত্তর দ্বীপের দক্ষিণ উপকূল কুক প্রণালির শক্তিশালী ঢেউয়ের মুখে উন্মুক্ত। এর সঙ্গে নুড়িপাথরের আলগা সৈকত ও ধারালো পাথর উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছিল। দুর্গম অবস্থানের কারণেও উদ্ধারকর্মীদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়।
স্থানীয় জেলে অ্যান্ড্রু সিম ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে বর্ণনা করেছেন। বৃহস্পতিবার সিএনএনের সহযোগী সংবাদমাধ্যম আরএনজেডকে তিনি বলেন, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই উপকূলে মাছ ধরছেন তিনি। এর আগে তিমি আটকে পড়ার ঘটনা দেখলেও পাইলট তিমিকে এভাবে উপকূলে আসতে কখনো দেখেননি।
সিম বলেন, তিমিগুলো কেন এখানে চলে এসেছে, তা তাঁর কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছে। এর পেছনে কোনো স্পষ্ট কারণও তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না।
কেন একসঙ্গে আটকা পড়ে পাইলট তিমি?
নিউজিল্যান্ডের সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পাইলট তিমি প্রায়ই দলবদ্ধভাবে উপকূলে আটকা পড়ে। তবে এ ধরনের গণ-আটকে পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক বিভাগের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ইয়ান এল বয়েড সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, সাধারণত সামাজিকভাবে দলবদ্ধ জীবনযাপন করে—এমন প্রজাতির তিমির মধ্যেই এ ধরনের ঘটনা বেশি দেখা যায়। কোনো একটি সামাজিক দলের পুরো অংশ বা কয়েকটি সদস্য একই সময়ে উপকূলে আটকা পড়তে পারে।
বয়েড আরও বলেন, অগভীর ও ধীরে ঢালু উপকূলীয় এলাকায় গণ-আটকে পড়ার ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটে। কোনো একটি তিমি বা পুরো দল দিক হারিয়ে ভাটার সময় অগভীর পানিতে আটকা পড়তে পারে। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়; এর পেছনে আরও জটিল কিছু বিষয় কাজ করতে পারে।
ডিওসির মতে, পাইলট তিমি অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী। কোনো একটি তিমি পথ হারালে অন্য তিমিরা তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। ফলে একটি তিমি আটকা পড়লে তার সঙ্গে দলের অন্য সদস্যরাও উপকূলে চলে আসতে পারে।
গণ-আটকে পড়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তিমির ইকোলোকেশন বা শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে অবস্থান নির্ণয়ের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথাও বলা হয়। অগভীর ও ঢালু পানিতে এই পদ্ধতি যথাযথভাবে কাজ না করায় তিমিরা বিভ্রান্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
গ্রীষ্মকালে বাড়ে তিমি আটকে পড়ার ঘটনা
নিউজিল্যান্ডে এখন গ্রীষ্মকাল। এ সময় খাবারের সন্ধানে পাইলট তিমিরা উপকূলের কাছাকাছি চলে আসে। দেশটিতে বছরের যে সময়ে সবচেয়ে বেশি গণ-আটকে পড়ার ঘটনা ঘটে, এটি তারও একটি সময়।
ডিওসির তথ্য অনুযায়ী, নিউজিল্যান্ডে সবচেয়ে বড় পাইলট তিমি আটকে পড়ার ঘটনা ঘটেছিল ১৯১৮ সালে। সে বছর চ্যাথাম দ্বীপপুঞ্জে আনুমানিক এক হাজার তিমি একসঙ্গে আটকা পড়েছিল।
ওশেনিয়া অঞ্চলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডের প্রত্যন্ত দ্বীপগুলোর কাছে হাঙর-অধ্যুষিত জলসীমায় একাধিক ঘটনায় প্রায় ৫০০ পাইলট তিমি মারা যায়।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া উপকূলে ১৫০টির বেশি তিমি আটকা পড়েছিল। সেগুলোর সবই মারা যায় অথবা প্রাণীদের দুরবস্থা বিবেচনায় প্রাণিসম্পদ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মৃত্যুর ব্যবস্থা করা হয়। তাসমানিয়ায় ৫০ বছরের মধ্যে এটিই ছিল তিমির প্রথম বড় ধরনের গণ-আটকে পড়ার ঘটনা।
এর আগের বছর পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে প্রায় ১৬০টি তিমি আটকা পড়েছিল। এতে ২৮টি পাইলট তিমির মৃত্যু হয়। তবে দলের অধিকাংশ তিমিকে আবার সমুদ্রে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
সূত্র: সিএনএন