ইরান যুদ্ধের ২৭তম দিন, যা ঘটছে

যুদ্ধের ২৭তম দিনে এসে স্পষ্ট যে সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই, বরং তা আরও বিস্তৃত ও তীব্র হয়ে উঠছে। তেহরান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুধু বাড়ছেই না, প্রতিটি ধাপে তা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। কূটনৈতিক আলোচনার গুঞ্জন শোনা গেলেও বাস্তবে ময়দানে চলছে পাল্টাপাল্টি শক্তি প্রদর্শন, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।

ইরানের ভেতরে: হামলা, প্রতিরোধ, আর কৌশল

ইসরায়েল ইতিমধ্যে ইসফাহানের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ব্যাপক হামলার কথা স্বীকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় দেশজুড়ে একের পর এক বড় আকারের আঘাত হানছে তারা। তেহরানে থাকা সংবাদদাতাদের ভাষায়, হামলার সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এর তীব্রতাও।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই বেসামরিক হতাহতের খবর সামনে এসেছে। শিরাজের একটি গ্রামে আবাসিক এলাকায় হামলায় নিহত হয়েছে দুই কিশোর, যা যুদ্ধের মানবিক মূল্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

অন্যদিকে, কূটনৈতিক বার্তায় তীব্র বিভাজন। ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন আলোচনা চলছে, কিন্তু ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা আলোচনায় নেই, বরং 'প্রতিরোধ' চালিয়ে যাবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, এই লড়াই থেকে পিছু হটার কোনো ইচ্ছা নেই তেহরানের।

সামরিক দিক থেকেও চাপ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, তারা ইতিমধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতার দুই-তৃতীয়াংশ ধ্বংস করেছে। একই সময়ে তেহরান সতর্ক করেছে  তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দখলের চেষ্টা হতে পারে।

এখানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। এটি কার্যত অচল হয়ে থাকায় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান চাইলে এই অবস্থাকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগিয়ে যেকোনো সমাধানের শর্ত নির্ধারণ করতে পারে। এমনকি প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে টোল আদায়ের নতুন আইন আনার প্রস্তুতিও নিচ্ছে দেশটির পার্লামেন্ট।

উপসাগরীয় অঞ্চল: ছড়িয়ে পড়ছে উত্তাপ

সংঘাত এখন সীমান্ত ছাড়িয়ে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। কুয়েতে হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ।

সৌদি আরব জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করেছে, যেগুলো তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চল লক্ষ্য করে পাঠানো হয়েছিল। বাহরাইনে একটি স্থাপনায় আগুন লাগার ঘটনাকেও “ইরানি আগ্রাসন” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও জানিয়েছে, তারা নিয়মিতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে যা ইঙ্গিত দেয়, যুদ্ধ এখন পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

যুক্তরাষ্ট্র: চাপ, হুমকি, আর কৌশলী বার্তা

ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও দাবি করেছেন, ইরান গোপনে চুক্তি করতে চায়, কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাপে তা প্রকাশ করতে পারছে না। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউস সতর্ক করেছে, চুক্তি না হলে ইরানের ওপর 'নরক নামিয়ে আনা' হবে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের বক্তব্য অনেকটাই কৌশলগত চাপ তৈরির অংশ। সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা জেসন ক্যাম্পবেলের মতে, ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্টতা রাখছেন, যাতে ইরান সর্বোচ্চ চাপ অনুভব করে।

ইসরায়েল: পাল্টা আঘাত আর উত্তেজনা

ইসরায়েল জানিয়েছে, খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ইরান থেকে দুটি বড় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঢেউ শনাক্ত করা হয়েছে। মধ্য ও উত্তরাঞ্চল লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রয়েছে।

এর পাশাপাশি লেবাননের পশ্চিম গ্যালিলি অঞ্চলে হিজবুল্লাহ রকেট হামলা চালাচ্ছে। ফলে যুদ্ধের পরিধি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

ইরাক ও লেবানন: নতুন ফ্রন্ট

উপসাগরীয় দেশগুলো ইরাককে আহ্বান জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ড থেকে ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধ করতে।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনারা লেবাননের ভেতরে প্রবেশ করে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়েছে। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনটির প্রধান নাইম কাসেম স্পষ্ট বলেছেন, এটি এখন শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ।

তেল ও খাদ্য বাজার: বৈশ্বিক প্রভাব

এই যুদ্ধের প্রভাব এখন বিশ্ববাজারে স্পষ্ট। তেলের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, কারণ উত্তেজনা কমার কোনো ইঙ্গিত নেই।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই সংঘাত বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায়ও বড় ধাক্কা দিতে পারে, এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে সরবরাহ ব্যবস্থায়।