লেবাননে শান্ত পরিস্থিতির পর আবারও ইসরায়েলি গুলি

লেবাননে মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে দুই দিনের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর নতুন করে রক্তপাত ঘটেছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সৈন্যদের মেশিনগানের গুলিতে দুইজন নিহত এবং আরও দুইজন আহত হয়েছেন। 

লেবাননে গত তিন দিনের মধ্যে ইসরায়েলি হামলায় এটিই প্রথম মৃত্যুর ঘটনা, যা গত রবিবার থেকে মূলত কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এই ঘটনাকে একটি ‘বিশ্বাসঘাতক হামলা’ এবং যুদ্ধবিরতির ‘প্রকাশ্য’ লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তবে এই হামলার জবাবে তারা কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেবে কিনা, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট করেনি।

লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ) মঙ্গলবার জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়া শহরের নিকটবর্তী একটি শহরে রাস্তা পরিষ্কার করার কাজে নিয়োজিত একটি খননযন্ত্রের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মানুষকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলি সৈন্যরা হঠাৎ মেশিনগান দিয়ে গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই দুই ব্যক্তি নিহত এবং অপর দুজন আহত হন।

এই হামলার সপক্ষে যুক্তি দিয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ লেবাননের ‘আলি আল-তাহের শৈলশিরা’ এলাকায় মোতায়েন থাকা ইসরায়েলি সৈন্যদের জন্য ‘তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টিকারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের’ ওপর এই হামলা চালিয়েছে। উল্লেখ্য, এই অঞ্চলটি দক্ষিণ লেবাননের এমন একটি এলাকার মধ্যে অবস্থিত, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনী এককভাবে একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ ঘোষণা করে রেখেছে।

হামলার পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এবং চিফ অফ দ্য জেনারেল স্টাফ ইয়াল জামির মঙ্গলবার একটি যৌথ বিবৃতি জারি করেছেন। সেখানে তারা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের সৈন্য ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি নিষ্ক্রিয় করার জন্য দৃঢ়তার সাথে কাজ করে যাবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সামরিক বাহিনী হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা অব্যাহত রাখবে এবং দক্ষিণ লেবাননে তাদের ঘোষিত নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রাখবে। এর আগে এক ভিডিও বিবৃতিতে নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেন, লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কাজের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে এবং যতদিন প্রয়োজন মনে হবে, ততদিন দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চলে তাদের অবস্থান দৃঢ় রাখা হবে।

এদিকে, ইসরায়েলের এই আগ্রাসী অবস্থানের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ইরানের প্রেস টিভির খবর অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর political council বা রাজনৈতিক পরিষদের উপপ্রধান মাহমুদ কামাতি আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে হিজবুল্লাহ তার উপযুক্ত জবাব দেবে। কামাতি বলেন, হিজবুল্লাহর প্রতিশোধও “যথাযথভাবে” আসবে। তিনি আরও যোগ করেন, পরিস্থিতি কোনোভাবেই আর “যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায়” ফিরে যাবে না, যখন ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ওপর প্রায় প্রতিদিন হামলা চালাত অথচ হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা গোলাবর্ষণ থেকে বিরত থাকত। মাহমুদ কামাতিকে উদ্ধৃত করে সংবাদ মাধ্যমটি জানায়, হিজবুল্লাহ বর্তমানে ট্রিগারে আঙুল রেখে সম্পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং ইসরায়েলি শাসনের যেকোনো ধরনের লঙ্ঘন বা হামলার মোকাবিলা করতে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।

লেবাননের এই সংকটের বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের এই হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়বদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা সবাই লেবাননের ওপর জায়নবাদী সত্তার অব্যাহত হামলা প্রত্যক্ষ করেছি। লেবাননে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর দায়বদ্ধতা পূর্ববর্তী ও বর্তমান চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার সুস্পষ্ট এবং জায়নবাদী সত্তার লেবাননে হামলা চালিয়ে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।” বাঘাই আরও উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধটি একটি “অত্যন্ত জটিল বিষয়”, তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই পরিস্থিতির একটি “চূড়ান্ত ব্যবস্থা” গ্রহণ করা হবে।

এমন এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই আজ ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে মার্কিন মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার একটি নতুন পর্ব শুরু হতে চলেছে, যা আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় মার্কিন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে লেবাননের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছেন রাষ্ট্রদূত নাদা মোয়াদ এবং ইসরায়েলি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লাইটার। লেবানন এই বৈঠক থেকে দেশটির দক্ষিণাঞ্চল থেকে সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার চাইছে, যেখানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী লেবাননের প্রায় ৬ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে একটি তথাকথিত ‘বাফার জোন’ বা বাফার অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেছে। অপরদিকে, ইসরায়েল দাবি করছে তারা হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ ‘নিরস্ত্রীকরণ’ চায়। তবে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই আলোচনা শুধুমাত্র ‘পারস্পরিক নিরাপত্তা’র বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত এবং তাদের সশস্ত্র প্রতিরক্ষার অস্ত্র অবশ্যই এই আলোচনার টেবিলের বাইরে রাখতে হবে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে চলমান ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৪,১০৬ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ১২ লাখের বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের সর্বশেষ এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে নিহতদের মধ্যে ইসরায়েলের অন্তত ৩২ জন সৈন্য এবং চারজন বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও মাঠপর্যায়ে লেবাননের সাধারণ বাসিন্দাদের মনে এখনো তীব্র সংশয় ও অবিশ্বাস কাজ করছে। হুলা শহরের ৬০ বছর বয়সী বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা মোহাম্মদ ইয়াসিন রয়টার্স সংবাদ সংস্থাকে বলেন, “যে মুহূর্তে তারা বলবে পথ খুলে গেছে এবং সবকিছু ঠিক আছে, তখনই আমি দক্ষিণ লেবাননে আমার বাড়িতে ফিরে যাব। তবে আমরা এই যুদ্ধবিরতিকে মোটেও বিশ্বাস করি না, কারণ ইসরায়েল চরম প্রতারক। তারা এমন জাতি নয় যারা নিজেদের দেওয়া কথা বা চুক্তি রক্ষা করে।”

একই ধরনের ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন ৬০ বছর বয়সী আরেক নারী সুজান। বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর দাহিয়েতে ইসরায়েলি ভয়াবহ বোমাবর্ষণের পর তিনি ও তার পুরো পরিবার এখন সম্পূর্ণ গৃহহীন। সুজান বলেন, “আমরা দাহিয়েতে একটি ভাড়া বাসায় থাকতাম, আর আমাদের সেই বাড়িগুলো এখন মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওরা এমনভাবে বোমা মেরেছে যে কোনো বাড়িই আর অবশিষ্ট নেই। আমরা এখন কোথায় যাব? আমরা নিজেরাও জানি না আমাদের ঠিকানা কোথায়।” ইসরায়েলের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, “আমাদের কোনো বিশ্বাস নেই, কারণ তারা এর আগেও বেশ কয়েকবার যুদ্ধবিরতির কথা বলেছে এবং তারপর আবার নতুন করে হামলা শুরু করেছে। সহজ কথায়, এরা এমন লোক যাদের কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না।”

সূত্র: আলজাজিরা