চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের আকাশে প্রথমবারের মতো একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর দীর্ঘ নাটুকে অভিযানে এর আরোহীদের উদ্ধার করা হলেও, পাইলটের দেওয়া একটি চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা মহলে তীব্র মতভেদ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
গোয়েন্দাদের একটি বড় অংশ খতিয়ে দেখছেন যে, ইরান এমন কোনো উন্নত ও গোপন সামরিক সক্ষমতা অর্জন করেছে কি না, যা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র আগে অবগত ছিল না। নাকি এটি কোনো পরীক্ষামূলক সংস্করণ অথবা মরুভূমির মরীচিকা ছিল,তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি।
সূত্র মতে, বিধ্বস্ত মার্কিন এফ-১৫ বিমানটি থেকে ইজেক্ট করার কয়েক ঘণ্টা পর পাইলটকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে, বিমানটির অস্ত্র ব্যবস্থা কর্মকর্তা (ডব্লিউএসও) একদিনের বেশি সময় ধরে পাহাড়ি এলাকায় ইরানি বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপন করে থাকার পর অবশেষে উদ্ধার পান। তবে উদ্ধার অভিযানের সময় মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানীদের হামলার তীব্রতা বোঝা যায় যখন এই অভিযানে অংশ নেওয়া দ্বিতীয় একটি এ-১০ যুদ্ধবিমানও ভূপাতিত হয়। সৌভাগ্যবশত, সেই বিমানের পাইলট ইরানের আকাশসীমার বাইরে নিরাপদে ইজেক্ট করতে সক্ষম হন। তবে উদ্ধার পাওয়া অস্ত্র ব্যবস্থা কর্মকর্তাটি সেই রহস্যময় ড্রোনের ঝাঁক দেখেছিলেন কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এদিকে, উদ্ধারকৃত এফ-১৫ পাইলটের দেওয়া বিবরণের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে গভীর সংশয় ও মতভেদ তৈরি হয়েছে। প্রথমত, বিমান দুর্ঘটনার সময় তিনি মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন। এছাড়া ইরান যুদ্ধের সময় এ নিয়ে তিনি দ্বিতীয়বার আকাশে গুলিবিদ্ধ হওয়ার শিকার হলেন। দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, সংঘাতের শুরুর দিকে কুয়েতি বাহিনীর নিজেদের মধ্যকার ভুলে ছোঁড়া গুলিতে (ফ্রেন্ডলি ফায়ার) নিহত পাইলটদের তালিকায় ভুলবশত এই পাইলটের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পাইলটের মানসিক ও শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে জিজ্ঞাসাবাদকারী গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন যে, তিনি যা দেখেছেন বলে দাবি করছেন, সে বিষয়ে তিনি আসলে কতটুকু নিশ্চিত। এই স্পর্শকাতর বিষয়ে মার্কিন বিমান বাহিনীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা প্রশ্নগুলো ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের কাছে পাঠিয়ে দেয়, কিন্তু সেন্ট্রাল কমান্ড সিএনএন-এর প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর দেয়নি। এমনকি জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের কার্যালয়ও এ বিষয়ে মন্তব্য করার অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
পাইলটের বিবরণ থেকে জানা গেছে, তিনি ইরানের ড্রোনের মধ্যে যে বিশেষ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রত্যক্ষ করেছেন, পরিভাষায় তাকে বলা হয় ‘ওয়ান-টু-মেনি মেশড নেটওয়ার্কিং’। সাধারণ ভাষায়, এই মেশড নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন মাত্র অপারেটর একই সময়ে একসঙ্গে একাধিক ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। যদিও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আগের মূল্যায়ন অনুযায়ী ইরানের কাছে এমন প্রযুক্তি থাকার কথা নয়, তবে সাম্প্রতিক বেশ কিছু প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান তার ড্রোন প্রযুক্তির আধুনিকায়নে চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে বড় ধরনের গোপন সহায়তা পেয়ে আসছে। রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলোর ইতিমধ্যেই এই সক্ষমতা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাত্ত্বিকভাবে এই মেশড নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তি অত্যন্ত নিরীহ কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব, যেমন কোনো বিদ্যমান অবকাঠামোবিহীন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করা।
তা সত্ত্বেও, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর পাশাপাশি নিকটবর্তী উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে সপ্তাহব্যাপী চলা সংঘাতে ইরান তার আক্রমণকারী ড্রোনগুলোকে যেভাবে একটি অপ্রতিসম অস্ত্র হিসেবে আগ্রাসীভাবে ব্যবহার করেছে, তাতে এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অঞ্চলটিতে মার্কিন ও তার মিত্রদের জন্য এক বিশাল উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড্রোন যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ বিশেষজ্ঞ এবং কাচাই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এমা বেটস সিএনএন-কে এই প্রযুক্তির ভয়াবহতা উল্লেখ করে বলেছেন যে, এভাবে নিখুঁতভাবে সমন্বয় করতে সক্ষম কোনো আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ রক্ত ও সম্পদ ব্যয় করতে হবে। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, যদি এই ড্রোনের ঝাঁক নিজেদেরকে আকাশে একটি চেনা আকৃতিতে ধরে রাখতে পারে, এবং যদি তার ভেতরে বিস্ফোরক থাকে, এমনকি প্রথম দফার গোলাবর্ষণে যা ধ্বংস হবে না তা পুনরায় আক্রমণ করার জন্য যদি এটি নিজস্ব সংরক্ষিত রসদ ধরে রাখতে পারে,তবে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও সক্ষম একটি যুদ্ধকৌশল।
ইরানের এই গোপন ও অত্যাধুনিক ড্রোন কর্মসূচি নিয়ে এমন এক সময়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন ও তোলপাড় উঠছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরান এই রক্তক্ষয়ী ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য একটি চুক্তি নিয়ে পর্দার আড়ালে আলোচনা চালাচ্ছে। গত সপ্তাহে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে উভয় পক্ষ ৬০ দিনের একটি আলোচনার সুযোগ শুরু করেছে। যদিও এই আলোচনা মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কেন্দ্র করে হওয়ার কথা রয়েছে, তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই টেবিলে বিভিন্ন ধরনের জটিল সামরিক ও কৌশলগত বিষয় উত্থাপন করেছে। এই কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়া এবং ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির এই নতুন রহস্য সমীকরণটিকে আরও জটিল করে তুলল।
সূত্র: সিএনএন
রাজনৈতিক সংকটে যুক্তরাজ্য, ১০ বছরে ৬ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ
মার্কিন-ইরান চুক্তি নিয়ে আশাবাদী গালিবাফ
ফ্রান্সে তীব্র তাপপ্রবাহ, দুই শিশুসহ ১৮ জনের মৃত্যু
কে হচ্ছেন যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী