বাসিজ মিলিশিয়ার কর্মকর্তাদের গোপন অডিও ফাঁস, তীব্র আতঙ্ক

ইরানের বাসিজ মিলিশিয়ার কর্মকর্তাদের একটি ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিংয়ে নতুন করে বিক্ষোভের ঝুঁকি এবং সদস্যদের অনলাইনে চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা শোনা গেছে। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যে বাহিনী মাঠে নামায়, তার ভেতরকার উদ্বেগের এমন বিরল চিত্র সচরাচর সামনে আসে না।

তেহরান প্রদেশের পাকদাশত এলাকায় মিডিয়া অ্যান্ড সাইবারস্পেস হেডকোয়ার্টারের এক বদ্ধদ্বার বৈঠকের অডিওতে কর্মকর্তারা সম্ভাব্য নতুন বিক্ষোভ, বাসিজ সদস্যদের অনলাইনে শনাক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং সরকারবিরোধী তৎপরতা ও ব্যক্তিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারির পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে রয়েছে বাসিজ সদস্য ও সরকারপন্থী ধর্মীয় গায়ক হামিদরেজা রাজাবজাদেহর হত্যাকাণ্ড এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা ও প্রভাব নিয়ে কর্মকর্তাদের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ। বিপ্লবী গার্ডের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই হেডকোয়ার্টার সাইবার কর্মী ও সরকার-সমর্থকদের নিয়ে গঠিত।

বৈঠকে উত্থাপিত এসব উদ্বেগের প্রতিধ্বনি মিলেছে পাকদাশতে বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার ইব্রাহিম গারমাবদারির সাম্প্রতিক মন্তব্যেও। তিনি বলেছিলেন, সরকারবিরোধীরা নিষেধাজ্ঞা, অনুপ্রবেশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসন কাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এই সপ্তাহের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বাসিজ আধা-সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে নিয়োগ দিয়েছেন অভিজ্ঞ গোয়েন্দা কর্মকর্তা হোসেন তায়েবকে। বিক্ষোভ দমনে অতীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এই কর্মকর্তাকে বাহিনীর তৃণমূল গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

বাসিজ সদস্যদের ওপর চাপ নিয়ে উদ্বেগ

বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা সরকারপন্থী বাহিনীর সদস্যদের ওপর ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও মানসিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রাজাবজাদেহর সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে বৈঠকের মূল বক্তা এই ঘটনাকে এক সতর্কবার্তা হিসেবে বর্ণনা করেন, সরকারপন্থী ব্যক্তিরা অনলাইন ও বাস্তব জীবনে দুই ক্ষেত্রেই লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন।

তিনি বলেন, এই চাপের উদ্দেশ্য হলো বাসিজ সদস্য, মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় ঘাঁটির কমান্ডারদের নিজেদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অনুতপ্ত বা লজ্জিত করে তোলা, যাতে সামাজিক প্রত্যাখ্যান এড়াতে তারা বিরোধী মতাদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বৈঠকের শুরুর দিকে শাহবাজি নামে পরিচিত একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, দেশের ভেতরকার উত্তেজনা এখনো প্রশমিত হয়নি এবং সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত চলতেই পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাসিজ সদস্যদের পরিচয় ফাঁসের শঙ্কা

আলোচনার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সম্ভাব্য ফাঁক এবং বাসিজ কর্মীদের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা। মূল বক্তা সতর্ক করেন, বিরোধী নেটওয়ার্কগুলো দলীয় ছবি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বাসিজ সদস্যদের শনাক্ত করে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য জোগাড় করতে পারে, যা পরবর্তীতে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপে ব্যবহৃত হতে পারে। তিনি অংশগ্রহণকারীদের মোবাইল ফোন নিয়েও অবিশ্বাস প্রকাশ করেন, এমনকি ইঙ্গিত দেন যে চ্যাটজিপিটির মতো অ্যাপ হয়তো তাদের কথোপকথন সরাসরি শুনতে পারে।

অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দুষলেন বক্তা

আলোচনার একপর্যায়ে ইন্টারনেট ফিল্টারিং নীতির সমালোচনা করলেও বক্তা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা সমস্যার জন্য ইন্টারনেট ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মকে দায়ী করেন। তার ভাষ্যে, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত জনরোষ আরও বাড়িয়েছে বটে, তবু অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকেই তিনি অস্থিরতা, মূল্যবৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এমনকি অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থী মাসুদ পেজেশকিয়ানের নির্বাচনে জয়ের পেছনের বড় কারণ বলে অভিহিত করেন।

তিনি আরও দাবি করেন, মোসাদসহ বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অর্থনৈতিক দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তরুণদের নিয়োগ করছে এবং বিনামূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা, সার্ভার ও ভিপিএন কনফিগারেশনের মতো প্রলোভন দেখিয়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করছে। ইরানের পার্লামেন্ট রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, ইন্টারনেট সেন্সরশিপ এড়াতে দেশটির ৮১ শতাংশ মানুষই ভিপিএনের ওপর নির্ভরশীল।

সরকারবিরোধী তৎপরতায় নজরদারির নির্দেশ

বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে একটি ‘অতি গোপনীয়’ নির্দেশনাও দেওয়া হয়, যাতে সাইবার কর্মীদের ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নজরদারি চালিয়ে পাকদাশত এলাকার বাসিন্দাদের বিক্ষোভ-সম্পর্কিত ও সরকারবিরোধী কার্যকলাপ নথিভুক্ত করতে বলা হয়। বৈঠকের নেতা বলেন, এই নজরদারি কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই চালাতে হবে, এমনকি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন বিক্ষোভ-সংক্রান্ত পোস্ট দিলেও তার স্ক্রিনশট নিতে হবে কর্মীদের।

তিনি নির্দেশ দেন, এসব স্ক্রিনশট ইরানি মেসেজিং অ্যাপ ইতা-র মাধ্যমে পাঠাতে হবে, সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাবার নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ফোন নম্বর ও কর্মস্থলের ঠিকানাসহ পরিচয়সূচক তথ্যও যুক্ত করতে হবে, যাতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে বিক্ষোভের হুঁশিয়ারি

বৈঠকের শেষদিকে পাকদাশতের এক আইআরজিসি সাইবার কর্মকর্তা নিকট ভবিষ্যতে ব্যাপক ও সহিংস বিক্ষোভের আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যার মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিও অন্যতম কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, ‘পরবর্তী অস্থিরতায়’ যাদের নিজস্ব গাড়ি নেই, তারাও পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে রাস্তায় নেমে আসতে পারে এবং ব্যাংক, দমকল বাহিনীর গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, বিশেষ করে বাসিজ সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।