ইরান যুদ্ধে কি মার্কিন দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে?

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম

ইরানের সঙ্গে চল্লিশ দিনের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সামর্থ্য নিয়ে এশীয় মিত্রদের মনে গভীর সংশয় তৈরি করেছে। ওয়াশিংটন একসঙ্গে একাধিক সংকট সামলাতে সত্যিই কতটা সক্ষম-এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে মিত্র দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের মধ্যে।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার একটি বড় ভিত্তি ছিল-প্রয়োজনে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মিত্রদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। ইরান যুদ্ধ সেই ভাবমূর্তিকে কঠিন এক পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। বড় কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে অন্য মিত্রদের নিরাপত্তা দেওয়ার মতো সম্পদ ও প্রস্তুতি আদৌ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকবে কি না, সেই প্রশ্ন এখন প্রকাশ্যে উঠে আসছে।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর এই উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ খরচ করেনি, একই সঙ্গে মিত্রদের আস্থাতেও চিড় ধরিয়েছে। বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে এমন এক সময়ে, যখন চীন দ্রুত তার সামরিক শক্তি বাড়িয়ে চলেছে এবং এশিয়ার দেশগুলো ক্রমেই জটিল এক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মুখোমুখি।

ফিলিপাইনের উদাহরণ এক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পষ্ট। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সঙ্গে সীমান্ত ও সামুদ্রিক বিরোধের কারণে দেশটি এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু চীনা কোস্টগার্ডের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি ম্যানিলা এখন অন্য শক্তিগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াতে শুরু করেছে। এটিকে নিছক কূটনৈতিক কৌশল বলা যাচ্ছে না, বরং এটি একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার সময় সরকারগুলো সাধারণত নিজেদের বিকল্প বাড়ানোর চেষ্টা করে, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা যত বাড়ে, একক কোনো মিত্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা তত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইরান যুদ্ধ যদি এশিয়ার দেশগুলোর মনে এই ধারণা তৈরি করে থাকে যে বড় সংঘাতে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও সামরিক সক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে অনেক মিত্রই বহুমুখী নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গড়ার পথে হাঁটবে এটাই স্বাভাবিক।

যুদ্ধের সামরিক মূল্য বিবেচনায় নিলে বিষয়টির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের ওপর যথেষ্ট চাপ ফেলেছে। মার্কিন বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে, কিছু ঘাঁটি খালি করতে হয়েছে, বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও কমে এসেছে। এসব ঘটনার তাৎক্ষণিক গুরুত্ব থাকলেও এর কৌশলগত তাৎপর্য সংখ্যার হিসাবের অনেক বাইরে বিস্তৃত।

মূল সমস্যাটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ ক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। কোনো দেশের সামরিক শক্তি তখনই প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে, যখন প্রতিপক্ষ ও মিত্র, উভয়েই সেই শক্তি প্রয়োগের সামর্থ্য ও ইচ্ছাশক্তিতে বিশ্বাস রাখে। মিত্ররা যদি মনে করে বড় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার সিংহভাগ সম্পদ ব্যয় করে ফেলে এবং একই সময়ে অন্য সংকটে সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা হারায়, তাহলে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

এশিয়া ও ইউরোপজুড়ে মিত্র ও নিরাপত্তা অংশীদারদের বিশাল এক নেটওয়ার্ক রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে, আর একই সময়ে তাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে চীন, রাশিয়া ও নানা আঞ্চলিক সংকট। একাধিক অঞ্চলে একসঙ্গে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারলে এই নেটওয়ার্ক ওয়াশিংটনের শক্তি বাড়ায়। কিন্তু কোনো বড় যুদ্ধ সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ গ্রাস করে ফেললে এই একই নেটওয়ার্ক হয়ে উঠতে পারে বাড়তি চাপের কারণ।

চীনও এই পরিবর্তিত হিসাব-নিকাশ থেকে সুবিধা নিতে পারে। বেইজিংয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে এশিয়া থেকে সরাসরি হটিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, একসঙ্গে একাধিক সংকট সামলানোর ব্যাপারে ওয়াশিংটনের প্রতি আস্থা কমে গেলেই যথেষ্ট। অঞ্চলের দেশগুলো যদি মনে করে বড় যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ও পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে পারবে না, তাহলে চীনের জন্য কৌশলগত সুযোগ বেড়ে যাবে। তাই যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা কেবল রণতরী, যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যার প্রতিযোগিতা নয়, মিত্রদের আস্থা ধরে রাখার প্রতিযোগিতাও বটে।

অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন কিংবা নতুন সরঞ্জাম উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে হয়তো ভবিষ্যতে সম্ভব হবে। কিন্তু একবার ভাঙা আস্থা ফিরিয়ে আনা অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ ও কঠিন কাজ। নিরাপত্তা সংক্রান্ত আস্থা গড়ে ওঠে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, আর সংকটের মুহূর্তে একা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা একবার তৈরি হলে সেই মানসিকতা বদলানো সহজ নয়।

চল্লিশ দিনের এই যুদ্ধকে শুধু রণক্ষেত্রের ফলাফল দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। এটি প্রমাণ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো সামরিক পরাশক্তিরও একাধিক ফ্রন্ট একসঙ্গে সামলানোর সম্পদ ও সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা আছে। এর প্রভাবে এশিয়ায় ধীরে ধীরে মিত্র দেশগুলোর আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে, নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো থেকে শুরু করে অন্যান্য শক্তির সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক বিস্তৃত করা পর্যন্ত।

ইরান যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য তাই শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, ঘাঁটি বা সামরিক সম্পদের হিসাবে সীমাবদ্ধ নয়। এর চেয়ে বড় ক্ষতি হলো, সংকটের মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকবে কি না, মিত্রদের মনে জন্ম নেওয়া এই সংশয়। প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এই যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক অধ্যায় নয়, এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামো বদলে দেওয়ার একটি টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের বাইরেও বিকল্প খুঁজতে শুরু করবে।

Attr/AHA
আরও পড়ুন