সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলার কথা নিশ্চিত করেছে দেশটির সরকার। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের দাবি, ওই ঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা ছিল, যা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারত। তবে তুরস্ক এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে হামলাকে সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের ওপর অবৈধ আঘাত হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাতে সিরিয়ার আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় ইসরায়েল। পরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে হামলার দায় স্বীকার করে।
বিবৃতিতে বলা হয়, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে যে স্থিতাবস্থা ছিল, তুরস্কের সেনা মোতায়েনের অনুমতি দিয়ে সিরিয়া সেটি ভঙ্গ করতে যাচ্ছিল। আলেপ্পোর কাছে ওই বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েন ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করবে বলে সিরিয়াকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়।
ইসরায়েলের দাবি, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় তারা ওই হামলা চালাতে বাধ্য হয়েছে। তবে তুরস্ক এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তুরস্কের সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অভিযোগ সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বেআইনি হামলাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা। তুরস্কের এক কর্মকর্তা আরও বলেছেন, ওই বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের কোনো সামরিক উপস্থিতি ছিল না এবং সেখানে সেনা মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনাও ছিল না।
হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কারণে। সিরিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত টম ব্যারাক ইসরায়েলের হামলাকে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে না।
ব্যারাক জানান, তুরস্ক, সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংঘাত এড়াতে একটি সমন্বয় ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। তাঁর মতে, হামলার আগে তুরস্ককে সতর্ক করা হয়নি। ফলে তুরস্কের সামরিক বাহিনী ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানকে নিজেদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি নিতে পারত।
তুরস্ক বর্তমানে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার অন্যতম প্রধান মিত্র। দেশটি সিরিয়ার সেনাবাহিনী পুনর্গঠন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মার্কিন বিশেষ দূতের মতে, ইসরায়েলের হামলার পেছনে তুরস্ক ওই বিমানঘাঁটিতে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে পারে, এমন একটি ধারণা কাজ করে থাকতে পারে। তবে এই ধারণা সঠিক ছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের তুরস্ক সীমান্তের কাছে অবস্থিত আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিটি ২০১৩ সাল থেকে নিয়মিত সামরিক বিমানঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় ঘাঁটিটির নিয়ন্ত্রণ একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে।
সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের সামরিক সূত্রের দাবি, ইসরায়েল ঘাঁটির রানওয়ে ও অস্ত্র সংরক্ষণাগারে আটটি বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে এতে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলা অবশ্য নতুন ঘটনা নয়। বহু বছর ধরে ইসরায়েল সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব কমানো এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্র সরবরাহ ঠেকানোর কথা বলে সেখানে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে আসছে। ২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের প্রতিও ইসরায়েলের সন্দেহ অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে একাধিক আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। মার্কিন দূত ব্যারাকের মতে, সাম্প্রতিক বিমান হামলার ঘটনা এই যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে।
তিনি বলেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগের বদলে তথ্য আদান-প্রদান ও সরাসরি যোগাযোগের আরও কার্যকর কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, সামরিক শক্তিকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার চেয়ে এ ধরনের সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যয় অনেক কম। সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল