জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটি কেন ইরানের লক্ষ্য?

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত ক্রমেই নতুন নতুন মাত্রা নিচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ ঘিরে পাল্টাপাল্টি হামলার পাশাপাশি এবার জর্ডানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিও ইরানের হামলার লক্ষ্য হয়েছে। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব দিতেই জর্ডানের আল-আজরাক এলাকার মুওয়াফাক সালতি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।

আল-আজরাক ঘাঁটি কোথায়?

মুওয়াফাক সালতি এয়ার বেস জর্ডানের পূর্বাঞ্চলের মরুভূমি এলাকায়, রাজধানী আম্মান থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। জর্ডানের যুদ্ধবিমান চালক লেফটেন্যান্ট মুওয়াফাক সালতির নামে ঘাঁটির নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৬৬ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি নিহত হন।

ঘাঁটিটি শুধু জর্ডানের নিজস্ব সামরিক স্থাপনা নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও জর্ডানের ২০২১ সালের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির আওতায় মার্কিন বাহিনী দেশটির ১২টি সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে মুওয়াফাক সালতি ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

কেন ঘাঁটিটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ?

আল-আজরাক ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমান ও সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে মার্কিন সামরিক বিমান, জনবল ও সহায়ক সরঞ্জাম মোতায়েন রয়েছে।

বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতে জর্ডানের ভৌগোলিক অবস্থান ঘাঁটিটিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। জর্ডান ইরাক, সিরিয়া, ইসরায়েল ও সৌদি আরবের কাছাকাছি হওয়ায় এখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা তুলনামূলকভাবে সহজ।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঘাঁটিটি বিমান পরিচালনা, নজরদারি এবং আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইরান কেন এটিকে লক্ষ্য করছে?

এর প্রধান কারণ জর্ডানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক।

তেহরানের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোও ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলা চালাতে ইরান জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করছে।

সাম্প্রতিক হামলার ক্ষেত্রে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে আল-আজরাক ঘাঁটির দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।

কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল?

জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত ইরান ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। এর মধ্যে ১৮টি জর্ডানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আকাশেই ধ্বংস বা প্রতিহত করে। বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে।

প্রাথমিকভাবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

তবে পরবর্তী এক প্রতিবেদনে মার্কিন সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর আসে। রয়টার্স জানিয়েছে, মুওয়াফাক সালতি ঘাঁটিতে হামলায় একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট বিমান গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় আটটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরে সেগুলো আবার ব্যবহারের উপযোগী করা হয়।

এটি প্রথম হামলা নয়

আল-আজরাক ঘাঁটি এর আগেও ইরানের হামলার লক্ষ্য হয়েছে। ১৭ জুলাই ইরান দাবি করেছিল, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন সামরিক বিমানকে আঘাত করা হয়েছে। পরে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করে।

অর্থাৎ, বর্তমান হামলাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জর্ডান কেন ঝুঁকিতে?

জর্ডান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পক্ষ নয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্কের কারণে দেশটি ক্রমেই সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়ছে।

জর্ডানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দেশটির নিরাপত্তার জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ইরানের দৃষ্টিতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক অবকাঠামোর অংশ। ফলে জর্ডান এখন কঠিন এক ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব, অন্যদিকে ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি।

সংঘাতের নতুন বিপজ্জনক দিক

আল-আজরাক ঘাঁটিতে হামলার তাৎপর্য শুধু জর্ডান বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেখাচ্ছে, হরমুজকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংঘাত এখন উপসাগর, জর্ডান, ইরাক, সিরিয়া ও অন্যান্য আঞ্চলিক সামরিক স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

এরই মধ্যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে এবং হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলও ব্যাপকভাবে কমেছে। ফলে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও চাপ বাড়ছে।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, ইরান যদি জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে এবং যুক্তরাষ্ট্র এর জবাবে আরও বড় হামলা চালায়, তাহলে জর্ডান কার্যত সংঘাতের একটি নতুন ফ্রন্টে পরিণত হতে পারে। আর তখন হরমুজের সংকট শুধু সমুদ্রপথের নিরাপত্তার বিষয় থাকবে না; এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যের জন্যও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।